অগ্নিপরীক্ষায় ব্যর্থ অধীর, ১৯৯১ থেকে ২০২৬ কি তবে রাজনীতির বৃত্ত সম্পূর্ণ হল?

অগ্নিপরীক্ষায় ব্যর্থ অধীর, ১৯৯১ থেকে ২০২৬ কি তবে রাজনীতির বৃত্ত সম্পূর্ণ হল?

কলকাতা: ১৯৯১ সালের সেই নবগ্রাম আর ২০২৬-এর বহরমপুর— মাঝে পেরিয়ে গিয়েছে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক। একসময়ের অপরাজেয় ‘রবিনহুড’ ইমেজ আর ফিনিক্স পাখির মতো প্রত্যাবর্তনের রূপকথা কি তবে এবার চিরতরে থমকে গেল? ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হারের ক্ষত নিয়ে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার যে মরণপণ লড়াইয়ে অধীররঞ্জন চৌধুরী নেমেছিলেন, ফলাফল বলছে সেখানেও তিনি ব্যর্থ। রাজনৈতিক মহলের মতে, নবগ্রাম দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, বহরমপুরের পরাজয় কি তবে সেই বৃত্তই সম্পূর্ণ করল?

উত্থান ও ফিনিক্সের গল্প

অধীর চৌধুরীর রাজনৈতিক উত্থান ছিল রূপকথার মতো। ১৯৯১ সালে প্রথম নির্বাচনে বাম ঝড়ে পরাজিত হলেও, ১৯৯৬ সালে সেই নবগ্রাম থেকেই বিপুল ব্যবধানে জিতে বিধায়ক হন তিনি। তবে তাঁর প্রকৃত ‘জাদুকরী’ ক্ষমতা দেখা গিয়েছিল ১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। বহরমপুরে কংগ্রেস যখন ধুঁকছে, তখন একক দক্ষতায় দলকে তৃতীয় স্থান থেকে টেনে তুলে প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন তিনি। সেই থেকে দীর্ঘ ২৫ বছর বহরমপুর ছিল তাঁর অভেদ্য দুর্গ। কিন্তু ২০২৪ সালে তৃণমূলের ইউসুফ পাঠানের কাছে পরাজয় সেই দুর্গে প্রথম ফাটল ধরিয়েছিল।

অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও পতন

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন অধীরের কাছে ছিল সম্মান পুনরুদ্ধারের লড়াই। লোকসভায় হারলেও বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে তাঁর লিড ছিল, আর সেই ভরসাতেই এবার এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, গত লোকসভা নির্বাচনের পতন আসলে ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী ধসের শুরু। একসময়ের গড় এখন হাতছাড়া, দ্বিতীয় স্থানে থেকেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাঁকে। এই হারের পেছনে মূলত কাজ করেছে রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তৃণমূলের ক্ষয়িষ্ণু শক্তির বিপরীতে বিজেপির উত্থান। মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়ায় অধীরের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা আর দলকে বৈতরণী পার করতে পারল না।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, তবুও প্রশ্ন উঠছে— ছাব্বিশই কি অধীরের শেষ লড়াই? ১৯৯১ সালে যে বিধানসভা নির্বাচন দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬-এর বিধানসভাতেই কি তার যবনিকা পড়ল? বিশ্লেষকদের মতে, এবারের পরাজয় অধীর চৌধুরীর দীর্ঘ সংসদীয় ও বিধানসভা রাজনীতির ক্যারিয়ারে সবথেকে বড় ধাক্কা। একদিকে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা আর অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, দুইয়ের সাঁড়াশী চাপে পড়ে ‘মুর্শিদাবাদের সুলতান’ কি তবে এবার অবসরের পথে হাঁটবেন, নাকি আবারও কোনো নতুন ফিনিক্স হয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন, তা সময় বলবে। তবে আপাতত তাঁর এই পরাজয় বাংলার রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *