মেদিনীপুরের ‘দাদা’ থেকে বাংলার অধিপতি, এক নজরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বর্ণময় রাজনৈতিক সফর!

মেদিনীপুরের ‘দাদা’ থেকে বাংলার অধিপতি, এক নজরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বর্ণময় রাজনৈতিক সফর!

অবিভক্ত মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র থেকে পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী—শুভেন্দু অধিকারীর এই উত্তরণ রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। শনিবার ব্রিগেডের ঐতিহাসিক ময়দানে কয়েক লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তিনি। গত সাড়ে তিন দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ছাত্রনেতা থেকে জননেতা এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন হওয়ার এই পথটি ছিল অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ ও নাটকীয়তায় ঠাসা। মেদিনীপুরের করকুলিতে জন্ম নেওয়া এই মেজো ছেলের হাত ধরেই বাংলায় গেরুয়া শিবিরের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো।

ছাত্র রাজনীতি থেকে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের নায়ক

শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক হাতেখড়ি হয়েছিল আশির দশকে কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে ছাত্র পরিষদের মাধ্যমে। বাবা শিশির অধিকারীর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শে বেড়ে ওঠা শুভেন্দু ২০০০ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূলে যোগ দেন। তবে তাঁর প্রকৃত রাজনৈতিক উত্থান ঘটে ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম জমি আন্দোলনের সময়। সেই সময় ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র ব্যানারে বাম আমলের দাপুটে নেতাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি হয়ে ওঠেন ‘নন্দীগ্রামের মুখ’। ২০০৯ ও ২০১৪ সালে তমলুকের সাংসদ হওয়া এবং পরবর্তীতে ২০১৬ সালে রাজ্যের পরিবহণ ও পরিবেশ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে তিনি নিজেকে দলের এক অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে প্রমাণ করেন।

বিদ্রোহ ও ঐতিহাসিক পালাবদলের কারিগর

তৃণমূলের অন্দরে সাংগঠনিক প্রভাব বাড়লেও পরবর্তীকালে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান নিয়ে তাঁর দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে। ২০২০ সালের শেষে তৃণমূলের সমস্ত পদ ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগদান করেন তিনি। এরপরই শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ—তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হন। গত পাঁচ বছরে রাজ্যজুড়ে নিবিড় জনসংযোগ এবং ২০২৬-এর নির্বাচনে ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন পেয়ে বিজেপিকে ম্যাজিক ফিগার পার করানোর প্রধান কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। খোদ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর খাসতালুক ভবানীপুরে পরাজিত করে শুভেন্দু প্রমাণ করেছেন যে, বাংলার রাজনীতিতে মেদিনীপুরের এই ভূমিপুত্র এখন এক অবিসংবাদিত নেতা।

শুভেন্দু অধিকারীর এই সাফল্যের মূলে রয়েছে তাঁর তৃণমূল স্তরের বলিষ্ঠ সংগঠন এবং মানুষের পালস বোঝার ক্ষমতা। নতুন সরকারের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো রাজ্যের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের গতি ফেরানো এবং গত কয়েক বছরের প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটিয়ে তোলা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে তাঁর এই জয় আগামী দিনে বাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

প্রতিবেদক: বর্তমান ঠাকুর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *