বিনা প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারে পঙ্গুত্ব! হাসপাতাল ও ডাক্তারকে ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানার নির্দেশ

হায়দ্রাবাদ: চিকিৎসা সেবার নামে চূড়ান্ত গাফিলতি এবং অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এক নারীর জীবন ধ্বংস করার দায়ে হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত যশোদা হাসপাতাল ও একজন স্পাইন সার্জনকে কঠোর শাস্তি প্রদান করেছে উপভোক্তা আদালত। ত্রিপুরার বাসিন্দা জুমা নাথকে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপরাধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে যৌথভাবে ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য উপভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন।
অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার ও তথ্যের কারচুপি
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পিঠের ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে আগরতলায় যশোদা হাসপাতালের স্পাইন সার্জন ডক্টর ভেঙ্কট রামকৃষ্ণ টি-র শরণাপন্ন হন জুমা নাথ। এমআরআই রিপোর্টে তাঁর ‘গ্রেড-১ স্পন্ডিলোলিস্থেসিস’ ধরা পড়ে, যা সাধারণত ওষুধ ও ফিজিওথেরাপির মাধ্যমেই নিরাময়যোগ্য। অভিযোগ উঠেছে, চিকিৎসক ওই নারীকে ভয় দেখান যে অস্ত্রোপচার না করলে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে পারেন। চিকিৎসকের আশ্বাসে হায়দ্রাবাদে গিয়ে অস্ত্রোপচার করানোর পর ওই নারীর অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়ে। তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলার ক্ষমতা হারান এবং হুইলচেয়ারে করে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগকারীর প্রাথমিক রিপোর্টে সমস্যাটি ‘গ্রেড-১’ পর্যায়ের থাকলেও, হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার সময় নথিতে সেটিকে ‘গ্রেড-২’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। নতুন করে এমআরআই না করেই কীভাবে নথিতে এই পরিবর্তন আনা হলো, তা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে কমিশন। ব্যাঙ্গালোরের নিমহ্যান্স (NIMHANS)-এর চিকিৎসকরাও এই ঘটনাকে ‘ফেইলড ব্যাক সিনড্রোম’ বা ব্যর্থ অস্ত্রোপচার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আর্থিক ও শারীরিক বিপর্যয়ের প্রভাব
ভুক্তভোগী জুমা নাথ পেশায় অল ইন্ডিয়া রেডিওর একজন অ্যানাউন্সার এবং গৃহশিক্ষিকা ছিলেন। মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা উপার্জনকারী এই নারী এখন অন্যের ওপর নির্ভরশীল। অস্ত্রোপচারের পর থেকে তাঁর জীবন কেবল অসহ্য যন্ত্রণা আর শারীরিক সীমাবদ্ধতার বৃত্তে বন্দি হয়ে গেছে। কমিশন তাঁর এই অপূরণীয় শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করেই এই বিপুল অঙ্কের জরিমানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং মামলার খরচ বাবদ ২০ হাজার টাকা আবেদনকারীকে প্রদান করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে হাসপাতালকে বার্ষিক ৯ শতাংশ হারে সুদ গুণতে হবে। এই রায় চিকিৎসা ক্ষেত্রে নৈতিকতা বজায় রাখা এবং রোগীদের অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।