পেট্রোল-ডিজেলের টেনশন শেষ! ভারতের অপরিশোধিত তেলের ভাণ্ডার বাড়ছে একধাক্কায় ৭০%

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া তীব্র জ্বালানি সংকটের মাঝেই ভারতের ‘এনার্জি সিকিউরিটি’ বা জ্বালানি সুরক্ষায় এক ঐতিহাসিক মোড় আসতে চলেছে। দেশের জরুরি খনিজ তেলের কৌশলগত ভান্ডার (স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ) এক ধাক্কায় প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে চলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি সংস্থা ‘আবু ধাবি ন্যাশনাল অয়েল কো ম্পা নি’ (ADNOC) ভারতে তাদের অপরিশোধিত তেলের মজুত ক্ষমতা বাড়িয়ে ৩ কোটি ব্যারেলে উন্নীত করার ব্যাপারে সম্মতি প্রকাশ করেছে। এর ফলে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ভারতের পেট্রোল ও ডিজেলের ঘাটতি মেটানোর সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে।
বর্তমানে ভারতের বিশাখাপত্তনম, ম্যাঙ্গালুরু এবং পাদুরে অবস্থিত কৌশলগত পেট্রোলিয়াম ভান্ডারের মোট ধারণক্ষমতা ৫.৩ মিলিয়ন টন বা প্রায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ ব্যারেল। নতুন চুক্তির আওতায় আবুধাবির সংস্থাটি তাদের মজুত ক্ষমতা ৩০ মিলিয়ন ব্যারেলে নিয়ে গেলে ভারতের মোট কৌশলগত ভান্ডারে আরও ৪০ লক্ষ টনেরও বেশি অপরিশোধিত তেল যুক্ত হবে। আরব আমিরাতের এই জ্বালানি সংস্থার সঙ্গে ‘ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভস লিমিটেড’ (ISPRL)-এর এই চুক্তিটি এমন এক সময়ে সম্পন্ন হলো, যখন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে ভারতের জ্বালানি আমদানির পথ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
রান্নাঘরের গ্যাস নিয়েও বড় চুক্তি
অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ভারতের আমজনতার রান্নাঘরের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতেও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশের শীর্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন’ (IOC)-এর সঙ্গে এলপিজি (LPG) সরবরাহ ও বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ADNOC। এটি ২০২৩ সালের বিদ্যমান চুক্তিরই একটি বর্ধিত রূপ, যা আগামী দিনে দেশে এলপিজি-র নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে ভারত সরকার দেশের রান্নার গ্যাসের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২০ থেকে ৩০ দিনের একটি পৃথক কৌশলগত মজুত ভান্ডার গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ ও কৌশলগত প্রভাব
এই বিপুল পরিমাণ তেল মজুতের মূল কারণ এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। সম্প্রতি খনিজ তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ‘ওপেক’ (OPEC) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ওপেকের কোটা সংস্কৃতির বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হয়ে আমিরাত এখন স্বাধীনভাবে তেল উৎপাদন বাড়াতে চায়। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩২ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন করা দেশটি ২০২৭ সালের মধ্যে তা ৫০ লক্ষ ব্যারেলে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
এই বাড়তি তেলের একটি বড় অংশ ভারতের মতো নির্ভরযোগ্য ও বিশাল বাজারে মজুত করে তারা বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চাইছে। অন্যদিকে, ভারতের জন্য এর প্রভাব হবে অত্যন্ত ইতিবাচক। যুদ্ধ বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ বা বিঘ্নিত হলেও, এই বিশাল অভ্যন্তরীণ মজুতের ওপর নির্ভর করে ভারত দীর্ঘ সময় সচল থাকতে পারবে। এছাড়া, পাবলিক-প্রाइवेट পার্টনারশিপ (PPP) মডেলে ওড়িশার চণ্ডীখোল এবং কর্ণাটকের পাদুরে দ্বিতীয় পর্যায়ের যে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত রিজার্ভ তৈরির কাজ চলছে, তা সম্পন্ন হলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক স্তরে এক অভেদ্য দুর্গে পরিণত হবে।