আইনি বিপাকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, উসকানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগে রুজু এফআইআর

বিধানসভা নির্বাচনের উত্তাপের মধ্যেই বড়সড় আইনি জটিলতায় জড়ালেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনী প্রচারে উসকানিমূলক ও আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিধাননগর উত্তর সাইবার ক্রাইম থানায় একটি এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে। রাজীব সরকার নামে এক সমাজকর্মীর দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে সাব-ইন্সপেক্টর সোমনাথ সিংহ রায়কে।
অভিযোগ ও আইনি ধারা
অভিযোগকারী রাজীব সরকারের দাবি, গত ২৭ এপ্রিল থেকে ৩ মে-র মধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নির্বাচনী জনসভা থেকে প্ররোচনামূলক বক্তব্য পেশ করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশেষ করে গত ৭ এপ্রিল কলকাতায় আয়োজিত একটি প্রাক-নির্বাচনী সভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করে দেওয়া তাঁর একটি মন্তব্যকে ঘিরে মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেখানে তৃণমূল সাংসদকে বলতে শোনা গিয়েছিল, “আমি দেখে নেব ৪ মে কে তাঁদের বাঁচাতে আসে। দিল্লি থেকে কোন গডফাদার তাঁদের রক্ষা করতে আসেন, তাও আমি দেখে নেব।” এফআইআর-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ডিজে বাজানো সংক্রান্ত বিতর্কিত মন্তব্য এবং বিরোধী কর্মীদের লক্ষ্য করে দেওয়া এই ধরণের আক্রমণাত্মক ও হুমকিসূলভ ভাষা সমাজে বিদ্বেষ ছড়াতে পারে। এর ফলে আইন-শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে দাঙ্গা বাঁধানোর উসকানি, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা তৈরি করা, ভীতি প্রদর্শন এবং মিথ্যা প্রচারের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে হাইকোর্টে মমতা
এই আইনি টানাপোড়েনের ঠিক একদিন আগেই রাজ্যে নির্বাচন-পরবর্তী হিংসা ও দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ তুলে সরাসরি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন দলের বর্ষীয়ান নেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও লোকসভায় দলের চিফ হুইপ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধান বিচারপতির এজলাসে সশরীরে হাজির হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে রাজ্যে ব্যাপক হিংসা ছড়িয়েছে। যেখানে অন্তত ১০ জন তৃণমূল কর্মী খুন হয়েছেন এবং ১৫০ থেকে ১৬০টি দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। আদালতে কিছু ছবি পেশ করে তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ প্রশাসনের চোখের সামনেই নারী, শিশু এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় তিনি আদালতের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
আদালতের কড়া নির্দেশ ও রাজনৈতিক প্রভাব
পরিস্থিতি বিবেচনা করে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা কড়া হাতে বজায় রাখার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে আদালত পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী হিংসার ভয়ে যাঁরা ঘরছাড়া হয়েছেন, রাজনৈতিক রং না দেখে তাঁদের নিরাপদে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এই মামলার গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি খোলা রেখে আদালত রাজ্য সরকারকে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা পেশ করার নির্দেশ দিয়েছে এবং পরবর্তী শুনানির জন্য আরও দুই সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। একদিকে রাজ্য জুড়ে ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ, আর অন্যদিকে খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে পুলিশের এই এফআইআর, সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক পারদ এক ধাক্কায় অনেকটাই চড়ে গিয়েছে।