ভোটের ফল বেরোতেই অগ্নিগর্ভ তিন জেলা, আক্রান্ত কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে ময়দানে নামল তৃণমূল

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের উপর লাগাতার হামলা এবং সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে এবার সরাসরি ময়দানে নামল তৃণমূল কংগ্রেস। শনিবার ঘাসফুল শিবিরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর এবং হুগলি জেলার একাধিক সহিংসতাপ্রবণ এলাকায় বিশেষ তথ্য-সন্ধানী দল বা ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং টিম পাঠানো হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, ফল ঘোষণার পর থেকে ওই সমস্ত এলাকায় বিরোধী দল সমর্থিত দুষ্কৃতীদের হাতে তাদের অসংখ্য কর্মী শারীরিক নির্যাতন ও ঘরছাড়া হওয়ার শিকার হয়েছেন।
ভরাডুবির পর কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার চেষ্টা
এবারের নির্বাচনে রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসনে জয়লাভ করেছে। এই বড়সড় বিপর্যয়ের পরপরই রাজ্য জুড়ে দলীয় কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা দলটির অন্দরে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ও কর্মীদের পাশে থাকার বার্তা দিতে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই এই ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং টিমগুলি গঠন করা হয়েছে। তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পূর্ব মেদিনীপুরের ময়না, তমলুক ও হলদিয়া এলাকায় পরিস্থিতি পরিদর্শনে যাচ্ছে। আক্রান্ত কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে বাস্তব চিত্র তুলে ধরাই এই দলের মূল লক্ষ্য। দোলা সেন অভিযোগ করেছেন, ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই তাদের কর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে, বহু মানুষ এলাকাছাড়া এবং বহু দলীয় কার্যালয় জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচন-পরবর্তী এই সহিংসতার জেরে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। হুগলি ও পূর্ব মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত উদ্বেগজনক ও আতঙ্কজনক খবর আসছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তৃণমূলের পক্ষ থেকে বেশ কিছু ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করা হয়েছে যে, তাদের মহিলা কর্মীরাও রেহাই পাচ্ছেন না। যদিও এই সব ভিডিওর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা যায়নি। একইসঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুরের ঘটনা প্রসঙ্গে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল। তাদের অভিযোগ, হিংসা চলাকালীন পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যত অনুপস্থিত ছিল।
কলকাতা হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই রাজনৈতিক সহিংসতার জল গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। পরিস্থিতি বিবেচনা করে গত বৃহস্পতিবারই কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, প্রতিশোধমূলক হিংসার আশঙ্কায় যাঁরা ঘরছাড়া হয়েছেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে অবিলম্বে নিরাপত্তা দিয়ে বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আদালতের এই নির্দেশকে স্বাগত জানিয়ে তৃণমূল আশা প্রকাশ করেছে যে প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের পর এই ধরনের সহিংসতা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তৃণমূলের এই ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং টিমের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনে এই রাজনৈতিক সংঘাত এবং আইনি লড়াই আরও তীব্র রূপ নিতে পারে।