দুধের পর এবার পাউরুটি, অগ্নিমূল্য বাজারে মধ্যবিত্তের প্রাতরাশেও টান

মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের জলখাবারের থালায় এবার সরাসরি আছড়ে পড়ল আন্তর্জাতিক অস্থিরতার আঁচ। বিশ্ববাজারে জ্বালানির চরম অনিশ্চয়তার ধাক্কায় সাধারণ মানুষের দৈনিক খাদ্যতালিকায় বড়সড় টান পড়তে শুরু করেছে। আমজনতার পকেটে কোপ মেরে দু-দিন আগেই দেশজুড়ে দুধের দাম বাড়ানো হয়েছিল। আর সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার এক ধাক্কায় বেশ কিছুটা বাড়ল পাউরুটির দাম। ভারতের বাণিজ্য নগরী মুম্বই এবং তার সংলগ্ন এলাকাগুলিতে আপাতত পাউরুটির দাম প্যাকেট পিছু সর্বোচ্চ ৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মুম্বইয়ের পর খুব শীঘ্রই দেশের অন্যান্য রাজ্যেও এই দাম-বৃদ্ধি কার্যকর হতে চলেছে।
আন্তর্জাতিক সংকট ও জ্বালানির জোড়া ধাক্কা
মূল্যবৃদ্ধির এই আকস্মিক খড়গের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে চলতে থাকা ইরান যুদ্ধ এবং তার জেরে দেশীয় বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটার পিছু প্রায় ৩ টাকা ৯০ পয়সা বেড়েছে। এর পাশাপাশি দিল্লি ও মুম্বইয়ের মতো মেগাসিটিগুলিতে সিএনজি (CNG)-র দামও ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানি তেলের এই চড়া দামের কারণে পণ্য পরিবহন এবং সরবরাহের গাড়িভাড়া অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, পাউরুটি সেঁকার জন্য বেকারিতে ব্যবহৃত গ্যাসের খরচ এবং পাউরুটি তৈরিতে প্রয়োজনীয় লবণ ও পচনরোধক রাসায়নিকের দামও এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়েছে। ফলে প্রস্তুতকারকদের একই সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ— দুই দিক থেকেই চড়া মার খেতে হচ্ছে।
প্যাকেজিংয়ের খরচ বৃদ্ধি ও নামী ব্র্যান্ডগুলির পদক্ষেপ
পাউরুটির এই দাম বাড়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো প্যাকেজিংয়ের আকাশছোঁয়া খরচ। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় এবং মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মূল্য হ্রাস পাওয়ায় প্লাস্টিক আমদানির খরচ বিপুল বেড়েছে। ভারতে পাউরুটি প্যাকিংয়ের জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিকের কাঁচামালের একটা বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে টাকার দাম পড়ে যাওয়ায় এবং চড়া জাহাজ ভাড়া যুক্ত হওয়ায় প্লাস্টিকের প্যাকেটের দাম অনেক বেশি দিতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির জেরে গত ১৬ মে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘মডার্ন ব্রেড’ তাদের সাধারণ পাউরুটির বিভিন্ন প্রকারের দাম বাড়িয়েছে। পাউরুটি প্রস্তুতকারক ও বেকারি মালিকদের মতে, উৎপাদন থেকে সরবরাহ— প্রতিটি স্তরের খরচ এখন সাধারণের নাগালের বাইরে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মডার্ন ব্রেডের এই পদক্ষেপের পর ‘ব্রিটানিয়া’ এবং ‘উইবস’-এর মতো অন্য বড় নামী ব্র্যান্ডগুলিও খুব দ্রুত পাউরুটির দাম বাড়ানোর পথে হাঁটতে চলেছে।
মধ্যবিত্তের সংসারে সম্ভাব্য প্রভাব
এর ঠিক কয়েক দিন আগেই ‘আমুল’ সমগ্র ভারতজুড়ে দুধের দাম লিটার পিছু ২ টাকা বাড়িয়েছিল। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হলো পাউরুটি। যেহেতু দুধ বা পাউরুটির মতো সামগ্রীগুলি সাধারণ মানুষ প্রতিদিন সকালে কেনেন, তাই দাম সামান্য বাড়লেও মাসের শেষে পারিবারিক বাজেটে তার এক বিশাল ও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে। গবেষকদের দাবি, জ্বালানি তেল এবং প্যাকেজিংয়ের খরচ যদি এইভাবেই বাড়তে থাকে, তবে খুব শীঘ্রই বিস্কুট এবং অন্যান্য প্যাকেটজাত খাবারের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। এবারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে গম বা ময়দার ঘাটতি দায়ী নয়, বরং খাবার তৈরি করা, প্যাক করা এবং তা বাজারে পৌঁছে দেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়াটাই মধ্যবিত্তের পকেট খালি হওয়ার আসল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।