ভয় দেখালেই লাখ টাকা হাওয়া! জালিয়াতদের রুখতে সিবিআইয়ের ব্রহ্মাস্ত্র ‘অভয়’

ভয় দেখালেই লাখ টাকা হাওয়া! জালিয়াতদের রুখতে সিবিআইয়ের ব্রহ্মাস্ত্র ‘অভয়’

ডিজিটাল দুনিয়ায় এখন এক নতুন আতঙ্কের নাম ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’। হোয়াটসঅ্যাপ বা স্কাইপ ভিডিও কলে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা কোনো ব্যক্তি হঠাৎ হাজির হয়ে দাবি করছেন, আপনার নথিপত্র ব্যবহার করে বিদেশে মাদক পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের মতো মারাত্মক অপরাধ হয়েছে। মুহূর্তে আপনাকে গ্রেপ্তার করার ভয় দেখিয়ে, ঘরের মধ্যে বন্দি থাকার নির্দেশ দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এই ধরনের অভিনব জালিয়াতি এবং ব্ল্যাকমেল রুখতে এবার ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI) নিয়ে এলো একটি বিশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক (AI) প্রযুক্তিগত হাতিয়ার, যার নাম ‘অভয়’।

কীভাবে ফাঁদ পাতে জালিয়াতরা

ডিজিটাল অ্যারেস্টের এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত চারটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন করে প্রতারকরা। প্রথমত, মাদক, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি বা অর্থ পাচারের মতো গুরুতর মামলার ভয় দেখানো হয়। দ্বিতীয়ত, “কাউকে জানালে বিপদ বাড়বে”—এই হুমকি দিয়ে ভুক্তভোগীকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা আইসোলেটেড করে ফেলা হয়। তৃতীয়ত, বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ভুয়ো আইডি কার্ড এবং থানার সেট বানিয়ে পুলিশের পোশাকে ভিডিও কল করা হয়। আর শেষ ধাপে, “তদন্ত বা জামিনের” নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে নম্বর ব্লক করে দেওয়া হয়।

আইনগতভাবে ভারতে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ বা ‘অনলাইন জেরা’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। পুলিশ, সিবিআই বা ইডি কোনো সংস্থাই ফোনে বা ভিডিও কলে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না। গ্রেপ্তারের জন্য সশরীরে ওয়ারেন্ট নিয়ে হাজির হওয়া বাধ্যতামূলক।

৩০ সেকেন্ডে মুখোশ খুলবে ‘অভয়’

প্রতারকদের এই এআই প্রযুক্তির চাল রুখতে সিবিআই-এর তৈরি ‘অভয়’ অ্যাপটি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। এটি প্রধানত চারটি উপায়ে অপরাধীদের শনাক্ত করে:

  • ভয়েস ক্লোন শনাক্তকরণ: অপরাধীরা এআই দিয়ে কোনো কর্মকর্তার কণ্ঠস্বর নকল করলে এটি মাত্র ৩০ সেকেন্ডে তা ধরে ফেলে।
  • ভিডিও ব্যাকগ্রাউন্ড স্ক্যান: ভিডিও কলের পিক্সেল, আলো ও ছায়া বিশ্লেষণ করে এটি জানিয়ে দেয় পেছনের থানাটি আসল নাকি কোনো কৃত্রিম স্টুডিও।
  • নম্বর ডেটাবেস যাচাই: সিবিআই ও পুলিশের সমস্ত অফিশিয়াল নম্বর এই অ্যাপের ডেটাবেসে রয়েছে। আগত কলটি তালিকায় না থাকলে সঙ্গে সঙ্গে লাল সংকেত দেখায়।
  • নথি পরীক্ষা: প্রতারকদের পাঠানো ভুয়া ওয়ারেন্ট বা আইডির কিউআর কোড, সিল ও ফন্ট স্ক্যান করে মাত্র ১০ সেকেন্ডে আসল-নকলের পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়।

সিবিআই-এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে এই অ্যাপটি ডাউনলোড করে সন্দেহজনক কলের স্ক্রিনশট বা রেকর্ড আপলোড করলেই সত্যতা জানা সম্ভব। সবুজ টিক এলে কলটি আসল এবং লাল ক্রস এলে তা শতভাগ ভুয়া বলে প্রমাণিত হবে।

প্রতিরোধের উপায় ও সম্ভাব্য প্রভাব

এই প্রযুক্তি বাজারে আসার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে এবং সাইবার অপরাধের গ্রাফ অনেকটাই নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সুরক্ষায় এই অ্যাপ বড় ভূমিকা রাখবে। সাইবার বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, সরকারি কোনো সংস্থা ফোনে ব্যাংক ডিটেইলস বা টাকা দাবি করে না। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং ‘১৯৩০’ হেল্পলাইনে দ্রুত রিপোর্ট করার মাধ্যমেই এই জালিয়াতি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *