সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদের মাঝে এক ফোনেই কেল্লাফতে, জাল ছড়িয়েছিল কেরল থেকে হরিয়ানায়

মেডিক্যালের প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-ইউজি ২০২৬ ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। গত ৩ মে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরেই সামনে আসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিস্ফোরক অভিযোগ। এর জেরে পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি আগামী ২১ জুন নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। দেশজোড়া এই কেলেঙ্কারির তদন্তে নেমে সিবিআই এবং স্পেশ্যাল অপারেশন গ্রুপ (এসওজি) এক অভাবনীয় মোড়ের মুখোমুখি হয়েছে। ধৃত ছাত্র অমিত মিনাকে সিবিআই যখন জিজ্ঞাসাবাদ করছিল, ঠিক তখনই তাঁর ফোনে ‘ঋষি’ নামের এক যুবকের কল আসে। আর সেই একটি ফোন কলেই খুলে যায় প্রশ্ন ফাঁসের এক বিশাল ও জটিল নেটওয়ার্কের দরজা।
তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালীন অমিতের ফোনে ঋষি জানতে চান, “টাকা কেন দেওয়া হয়নি?” পাশাপাশি আগামী ২০২৭ সালেও আরও বেশি টাকা আয়ে সাহায্য করার প্রলোভন দেখান তিনি। তদন্তকারীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে অমিতকে ইশারা করেন ঋষিকে দেখা করার কথা বলতে। কিন্তু সন্দেহ হওয়ায় ঋষি ফোন কেটে দেন। এই ঋষি হলেন প্রশ্ন ফাঁসের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রাজস্থানের বিওয়াল পরিবারের সদস্য। জেরায় অমিত স্বীকার করেছেন যে, তিনি ৫ লক্ষ টাকায় নিটের প্রশ্নপত্র কিনে পরে তা চড়া দামে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এর আগে ২০২৫ সালেও ঋষির পরিবারের ৫ জন একইভাবে নিট পাশ করেন বলে তথ্য মিলেছে, যা গত বছরের পরীক্ষাকেও সন্দেহের আওতায় এনেছে।
বহু হাত ঘুরে যেভাবে ছড়াল প্রশ্নপত্র
তদন্তে নেমে রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র ও কেরল জুড়ে বিস্তৃত এক শক্তিশালী চক্রের সন্ধান পেয়েছেন তদন্তকারীরা। জানা গেছে, প্রশ্নপত্রটি প্রথমে রাজস্থানের সিকার থেকে চুরি হয়ে কেরলে পাঠরত এক ডাক্তারি পড়ুয়ার কাছে পৌঁছায়। সেই ছাত্র প্রশ্নটি পাঠান তাঁর বাবার কাছে, যিনি সিকারে একটি পিজি (পেয়িং গেস্ট) চালাতেন। ওই পিজি-র ছাত্রীদের প্রশ্নপত্রটি দেওয়া হলে পরীক্ষার পর তারা হুবহু মিল খুঁজে পায় এবং বিষয়টি জানাজানি হতেই চক্রের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। এছাড়া রাজস্থানের এক সরকারি কর্মচারীর হাত ঘুরে প্রশ্নটি যায় শশীকান্ত সুথার নামে এক রসায়নের শিক্ষকের কাছে, যিনি গুরুকৃপা কোচিং ইনস্টিটিউটের সাথে যুক্ত। পরবর্তীতে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা এনটিএ-র নজরে আসে।
চক্রের শিকড়ে সিবিআই
এই চক্রের পেছনে থাকা একের পর এক রাঘববোয়ালকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে সিবিআই। এই কেলেঙ্কারির অন্যতম মূল মাথা (কিংপিন) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে রসায়নের অধ্যাপক পিভি কুলকার্নিকে, যিনি এনটিএ-র গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক ছিলেন এবং সেই সুবাদে প্রশ্নপত্র দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এছাড়াও মহারাষ্ট্রের লাতুরের আরসিসি কোচিং কেন্দ্রের কর্ণধার শিবরাজ মোতেগাঁওকার ওরফে ‘এম স্যর’ সহ মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অমিতের সূত্র ধরে ঋষির বাবা দীনেশ বিওয়াল, কাকা মঙ্গিলাল বিওয়াল এবং সাওয়াই মাধোপুরের ডাক্তারি ছাত্র বিকাশ বিওয়ালকে আটক করা হয়। তাঁদের জেরা করে হরিয়ানা নেটওয়ার্কের গুরুগ্রামের যশ যাদব এবং নাসিকের শুভম খৈরনারের নামও সামনে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, ২০২৫ সালের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল নাসিক থেকে এবং এবারের মূল উৎস ছিল হরিয়ানা-ভিত্তিক একটি চক্র।