একদা ক্ষমতার অলিন্দে থাকা শান্তিনিকেতনে এখন শুধুই ভাঙনের সুর!

দক্ষিণ কলকাতার ১৮৮এ, হরিশ মুখার্জি রোডের প্রাসাদোপম বাড়ি ‘শান্তিনিকেতন’ ঘিরে একসময় যে রহস্য ও ক্ষমতার দম্ভ ছিল, তা আজ এক লহমায় ফিকে হয়ে গেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বাসভবনটি দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ছিল রাজ্য রাজনীতির অন্যতম পাওয়ার হাউস। ৪ মে-র পর থেকে সেই চেনা ছবিটা পুরোপুরি বদলে গেছে। যেখানে একসময় জেড প্লাস ক্যাটেগরির নিরাপত্তা এবং ভিআইপি কনভয়ের দাপট ছিল, সেখানে এখন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর স্লোগানের গর্জন শোনা যাচ্ছে।
ভিআইপি করিডোর থেকে সাধারণের মুক্তাঞ্চল
বহু বছর ধরে এই এলাকার বাসিন্দারা ভোর হতেই রাস্তা খালি করা, সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন এবং কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপ দেখে অভ্যস্ত ছিলেন। সাধারণ মানুষের চলাচলের রাস্তাটি কার্যত একটি ব্যক্তিগত করিডোরে পরিণত হয়েছিল। অথচ আজ সেই চত্বরে ভিড় জমাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও করছেন, কেউ তুলছেন সেলফি, আবার কেউবা প্রকাশ্যেই ‘চোর চোর’ স্লোগান দিয়ে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা নিজেদের এলাকাতেই একপ্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন, যা এখন মুক্ত হয়েছে। অভিষেকের বাড়ির সামনের পুলিশ বুথের বাতিস্তম্ভে এখন শোভা পাচ্ছে বিরোধী দল বিজেপির পতাকা।
পুরসভার নোটিশ ও বুলডোজারের হুঁশিয়ারি
কলকাতার এই ‘শান্তিনিকেতন’ বাড়িটিকে ঘিরে বহু বছর ধরেই নানাবিধ গুঞ্জন ছড়িয়েছে। ভেতরের এসকেলেটর, বিদেশি মার্বেল কিংবা সোনার কলের মতো বিলাসবহুল উপাদানের গল্প সাধারণ মানুষের মধ্যে একে এক অনবদ্য ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত করেছিল। তবে বর্তমানে কলকাতা পুরসভার স্ক্যানারে রয়েছে অভিষেকের মোট ১৭টি সম্পত্তি। যার মধ্যে হরিশ মুখার্জি রোড ও কালীঘাট রোডের বাড়িতে ইতিমধ্যেই পুরসভার পক্ষ থেকে নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরসভার দাবি, এই ভবন নির্মাণে মূল নকশা লঙ্ঘন করে ‘প্ল্যান-বহির্ভূত’ বেআইনি অংশ তৈরি করা হয়েছে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে এই অংশ নিজে থেকে ভেঙে না ফেলা হলে পুরসভা বুলডোজার দিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ঝুঁকতে নারাজ অভিষেক
দলের যুব সংগঠন থেকে উঠে এসে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে তাঁর আক্রমণাত্মক স্টাইল এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগের তীব্র চ্যালেঞ্জের আবহ এখন ভিন্ন মোড় নিয়েছে। তবে এই চরম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন তিনি। দলের বিধায়কদের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, বাড়ি ভেঙে দিলেও তিনি কোনো অবস্থাতেই মাথা নত করবেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার এই পালাবদল এবং বাড়িটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতা হরিশ মুখার্জি রোডের রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।