ভোটে ভরাডুবির পর তৃণমূলে তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ সামাল দিতে কুণালদের কালীঘাটে তলব মমতার

নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না হওয়া এবং দলের কঠিন সময়ে ফলতার জাহাঙ্গির খানের পিঠটান দেওয়ার ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে বিদ্রোহের সুর তীব্র হয়ে উঠেছে। দলের একাংশের এই ক্ষোভ ও ‘বিদ্রোহ’ সামাল দিতে এবার সরাসরি ময়দানে নামলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বুধবার বিকেলে দলের তিন জয়ী বিধায়ক—বেলেঘাটার কুণাল ঘোষ, উলুবেড়িয়া পূর্বের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির সন্দীপন সাহাকে কালীঘাটের বাসভবনে ডেকে পাঠান দলীয় সুপ্রিমো।
ঘটনার সূত্রপাত ফলতার নেতা জাহাঙ্গির খানের একটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। বৃহস্পতিবার ফলতায় পুনর্নির্বাচনের ঠিক আগে, মঙ্গলবার প্রচারের শেষ দিনে জাহাঙ্গির আচমকা ঘোষণা করেন যে তিনি এই ভোটে লড়ছেন না। দলের এই দুঃসময়ে তাঁর এমন সিদ্ধান্তকে ‘পিঠটান’ হিসেবে দেখছেন দলেরই একাংশ। কুণাল, ঋতব্রত এবং সন্দীপন—এই তিন বিধায়ক প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন, এত বড় ঘটনার পরও কেন জাহাঙ্গির খানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে না? যদিও শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, এটি জাহাঙ্গিরের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং এর সাথে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও মঙ্গলবারের বৈঠকে এই বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন। তবে তাতে ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি, উল্টো নাম না করে শীর্ষ নেতৃত্বের দিকেই আঙুলের নির্দেশ ও ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নেতা’ বলে কটাক্ষ ছুড়ে দেওয়া হয়।
বিদ্রোহের কারণ ও অন্দরের সমীকরণ
তৃণমূলের অন্দরে এই নজিরবিহীন ক্ষোভের প্রধান কারণ হলো নেতৃত্বের একাংশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং দলের শৃঙ্খলা রক্ষা নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা। বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের বক্তব্য, এসি ঘরে বসে বৈঠক না করে দলের কর্মীদের মন খুলে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। এর আগে ক্ষোভ থাকলে তা লিখিত আকারে জানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কিন্তু মঙ্গলবারের বৈঠকে কুণাল ঘোষদের আক্রমণাত্মক মনোভাব প্রমাণ করেছে যে সেই দাওয়াই কাজ করেনি। মূলত দলের অভ্যন্তরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একতরফা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই এই বিদ্রোহের সুর চড়েছে।
সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব
তৃণমূলের মতো সুশৃঙ্খল দলে এভাবে প্রকাশ্য বিদ্রোহ এবং শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে আঙুল তোলার ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধানসভা বা লোকসভা ভোটের ধাক্কার পর এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল দলের নিচুতলার কর্মীদের মনোবল আরও ভেঙে দিতে পারে। বিশেষ করে পুনর্নির্বাচনের ঠিক আগে এমন ফাটল দলের ভোটব্যাংকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে উদ্যোগী হয়ে কালীঘাটে ডাকার পর, বরফ কতটা গলে এবং জাহাঙ্গির খানের বিরুদ্ধে দল কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে তৃণমূলের আগামী দিনের অভ্যন্তরীণ স্থায়িত্ব।