ক্ষমতায় বসার ১১ দিনের মাথায় মেগা অ্যাকশন! বিএসএফ-এর হাতে ২৭ কিমি জমি তুলে দিয়ে ‘ডিপোর্ট’ ও ‘সিএএ’ আইন কার্যকর করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু

রাজ্যের মসনদ বদলের পর আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষা এবং অনুপ্রবেশ ইস্যুতে সবথেকে বড় এবং ঐতিহাসিক পদক্ষেপটি নিয়ে নিলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার ঠিক ১১ দিনের মাথায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া (Fencing) এবং আউটপোস্ট তৈরির জন্য বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বা বিএসএফ (BSF)-এর হাতে বহু প্রতীক্ষিত জমি তুলে দিল নতুন রাজ্য সরকার।
একই সাথে বুধবার (২০শে মে) নবান্ন থেকে আয়োজিত এক হাই-প্রোফাইল সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে এবার থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’ নীতি রাজ্যে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কার্যকর করা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে দেওয়া ‘কথা’ রক্ষার্থেই যে এই যুদ্ধকালীন তৎপরতা, তাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
২ সপ্তাহের মধ্যে জমি চিহ্নিতকরণ, আমলাদের তৎপরতা
বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের দীর্ঘদিনের টালবাহানা ও লালফিতের ফাঁস এক ঝটকায় কেটে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান:
“ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত করতে বিএসএফ এবং কেন্দ্রীয় সরকার দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের কাছে জমি চেয়ে আসছিল। কিন্তু আগের সরকার তোষামদের রাজনীতির কারণে তা দিতে চায়নি। যার ফলে সীমান্ত এলাকাগুলি এই মুহূর্তে অত্যন্ত অসুরক্ষিত ও খারাপ অবস্থায় রয়েছে। আমাদের সরকারের আমলারা, বিশেষ করে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দফতরের সচিবরা মাত্র ২ সপ্তাহের মধ্যে অত্যন্ত তৎপরতার সাথে কাজ করে ২৭ কিলোমিটার সীমান্ত বেড়া ও আউটপোস্টের জন্য জমি চিহ্নিত করেছেন এবং আজ তা আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।”
পরিসংখ্যান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, পশ্চিমবঙ্গের মোট ২,২০০ কিমি আন্তর্জাতিক সীমান্তের মধ্যে ১,৬০০ কিমিতে কাঁটাতার থাকলেও, বাকি ৬০০ কিমি অংশ সম্পূর্ণ খোলা ও অরক্ষিত ছিল। ২০১৬ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং থেকে শুরু করে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বিগত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার জমি হস্তান্তর করেনি।
অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি গ্রেফতার ও ‘ডিপোর্ট’ করার মেগা গাইডলাইন
সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারীদের জন্য নবান্নের তরফ থেকে জারি করা হয়েছে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, ২০২৫ সালের ১৪ই মে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। বিগত জমানায় তা কার্যকর না হলেও, ছাব্বিশের মে মাসের এই বুধবার থেকেই তা আইনত বলবৎ করা হলো।
রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “রাজ্যে লাভ জেহাদ, বলপূর্বক ধর্মান্তর, নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে যে ধরনের অসামাজিক কাজকর্মের বৃদ্ধি আমরা লক্ষ্য করেছি, তদন্তে দেখা গেছে যারা তার সঙ্গে যুক্ত বলে ধরা পড়েছে, তাদের একটা বড় অংশই বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। এবার থেকে অনুপ্রবেশকারীদের ধরতে পারলেই রাজ্য পুলিশ সরাসরি গ্রেফতার ও আটক করবে এবং বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেবে। বিএসএফ আন্তর্জাতিক প্রোটোকল মেনে ওপার বাংলার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি)-এর সঙ্গে কথা বলে তাদের ডিপোর্ট বা ফেরত পাঠাবে।”
৩১শে ডিসেম্বরের ডেডলাইন: সিএএ-যোগ্যদের অভয়বাণী
এই কড়া প্রশাসনিক অভিযানের মাঝেই রাজ্যের উদ্বাস্তু ও শরণার্থী ভাই-বোনদের বড়সড় স্বস্তি ও অভয় দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) নিয়ে কেন্দ্রের গাইডলাইন স্পষ্ট করে তিনি জানান:
- কারা সুরক্ষিত: ২০২৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সিএএ আইনে নির্দিষ্ট করা ওপার বাংলার ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যে সমস্ত মানুষ ভারতে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্বের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং রাজ্যে তাঁদের কোথাও কোনো রকম হেনস্থার মুখে পড়তে হবে না।
- কারা অবৈধ: এই সুনির্দিষ্ট সময়সীমা অর্থাৎ ২০২৪-এর ৩১শে ডিসেম্বরের পর যাঁরা অবৈধ উপায়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলায় এসেছেন বা আসছেন, তাঁদের কোনোভাবেই রেয়াত করা হবে না। পুলিশ সরাসরি তাঁদের গ্রেফতার করে ডিপোর্টেশনের জন্য পাঠাবে।
নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীকে বিএসএফ-এর রাজকীয় সংবর্ধনা
সীমান্তের কাঁটাতারের জট কাটাতে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর এই নজিরবিহীন ও দ্রুত সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক স্বাগত জানিয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীও। নবান্নে প্রশাসনিক বৈঠকের মাঝেই বিএসএফ-এর উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে একটি চমৎকার ফুলের তোড়া এবং বিশেষ স্মারক (Memento) দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন পুর নিয়োগ দুর্নীতিতে দেবরাজ চক্রবর্তীর সিআইডি/সিবিআই হেফাজত, সল্টলেক ও কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তিতে পুরসভার বুলডোজার নোটিশ এবং নদিয়ায় মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে এফআইআর নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস চারদিক থেকে চরম কোণঠাসা, ঠিক তখনই শুভেন্দু অধিকারী ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ও ‘সীমান্ত সুরক্ষা’ ইস্যুকে সামনে এনে রাজ্য ও দেশের রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী মাস্টারস্ট্রোক দিলেন। এর ফলে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সুরক্ষা যে এক নিশ্ছিদ্র ঘেরাটোপে চলে আসতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।