ইসলামপুর হলো কৃষ্ণনগর! পাকিস্তানে আচমকা কেন মুসলিম রাস্তার নাম বদলে রাখা হচ্ছে হিন্দু ও শিখ নাম?

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে এবার এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ সরকার। কয়েক দশক ধরে যে সমস্ত রাস্তা, চত্বর বা মহল্লা পাকিস্তানের দেশভাগ-পরবর্তী ইসলামিক পরিচয়ের সাথে যুক্ত নাম বহন করছিল, এবার সেগুলি মুছে ফেলে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে ১৯৪৭ সালের আগের মূল সনাতনী নাম। সোমবার পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সরকারের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক সরকারিভাবে এই মেগা পরিকল্পনার অনুমোদন পাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।
ছাব্বিশের মে মাসে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তানের এই আকস্মিক ও চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে। কট্টরপন্থী দেশ হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানে হঠাৎ কেন মুসলিম নাম বদলে হিন্দু ও শিখ নাম ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে ওয়াকিবহাল মহলে।
নওয়াজ শরিফের বিশেষ প্রস্তাবে সিলমোহর দিল মরিয়ম নওয়াজের ক্যাবিনেট
প্রাদেশিক প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই সম্পূর্ণ পরিকল্পনার নেপথ্য মস্তিষ্ক বা রূপকার হলেন পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। তিনি বর্তমানে ‘লাহোর হেরিটেজ এরিয়াস রিভাইভাল’ (Lahore Heritage Areas Revival) প্রকল্পের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন এবং তাঁর দেওয়া খসড়া প্রস্তাবের ভিত্তিতেই এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে চলেছে।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো, দেশভাগের আগে লাহোরের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রধান অংশ গড়ে তোলা হিন্দু, শিখ এবং জৈন সম্প্রদায়ের স্মৃতি ও অবদানকে শহরের বুকে পুনরুজ্জীবিত করা। বছরের পর বছর ধরে ঔপনিবেশিক আমলের এবং দেশভাগের আগের প্রাচীন নামগুলি মুছে যেভাবে পাকিস্তানি নেতা, ইসলামি ব্যক্তিত্ব বা মুসলিম মনীষীদের নাম চাপানো হয়েছিল, এবার তা প্রত্যাহৃত হচ্ছে।
ইসলামপুর হলো কৃষ্ণনগর! এক নজরে লাহোরের প্রধান নাম পরিবর্তনের তালিকা
প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পের অধীনে লাহোরের একাধিক বিখ্যাত রাস্তা ও চত্বরের নাম এক ধাক্কায় বদলে যাচ্ছে। সবথেকে বড় পরিবর্তনটি ঘটছে ‘ইসলামপুর’ এলাকায়, যার প্রাচীন নাম ‘কৃষ্ণনগর’ আবার সরকারিভাবে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। নিচে প্রধান কয়েকটি নাম পরিবর্তনের তালিকা দেওয়া হলো:
| বর্তমান মুসলিম/পাকিস্তানি নাম | পুনরুদ্ধার হওয়া দেশভাগের আগের মূল নাম |
| ইসলামপুর | কৃষ্ণনগর |
| সুন্নতনগর | সন্তনগর |
| মুস্তাফাবাদ | ধরমপুরা |
| রেহমান গলি | রাম গলি |
| বাবরি মসজিদ চক | জৈন মন্দির রোড |
| গাজিয়াবাদ | কুমারপুরা |
| হামিদ নিজামি রোড | টেম্পল স্ট্রিট |
| মৌলানা জাফর আলি খান চক | লক্ষ্মী চক |
| নিস্তার রোড | ব্র্যান্ড্রেথ রোড |
| জিলানি রোড | আউটফল রোড |
| ফাতিমা জিন্নাহ রোড | কুইন্স রোড |
| আল্লামা ইকবাল রোড | জেল রোড |
| স্যার আগা খান রোড | ডেভিস রোড |
| বাগ-ই-জিন্নাহ রোড | লরেন্স রোড |
| শাহরাহ-ই-আব্দুল হামিদ বিন বদিস | এমপ্রেস রোড |
ফিরছে ঐতিহ্যবাহী কুস্তির আখড়া ও মিন্টো পার্কের দশেরা ময়দান
রাস্তার নাম বদলের পাশাপাশি লাহোরের ঐতিহাসিক ‘মিন্টো পার্ক’ (যা বর্তমানে গ্রেটার ইকবাল পার্ক নামে পরিচিত) এলাকাটিকেও তার পুরনো গৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মরিয়ম নওয়াজের সরকার। নওয়াজ শরিফের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই পার্কে দেশভাগের আগের তিনটি ক্রিকেট মাঠ এবং একটি ঐতিহ্যবাহী কুস্তির আখড়া পুনর্নির্মাণ করা হবে। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যখন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলি ভেঙে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল।
এই মিন্টো পার্কের ক্রিকেট ক্লাবেই একসময় পাকিস্তানের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক ইনজামাম-উল-হকের পাশাপাশি দেশভাগের আগে কিংবদন্তি ভারতীয় ক্রিকেটার লালা অমরনাথও নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, পার্কের কুস্তির আখড়াটিতে একসময় গামা পালোয়ান, গুঙ্গা পালোয়ান এবং ইমাম বখশের মতো উপমহাদেশের কিংবদন্তি কুস্তিগীররা লড়াই করেছেন। শুধু তাই নয়, ১৯৪৭ সালের আগে এই মিন্টো পার্কটিই ছিল লাহোরের প্রবাসী হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বিজয়া দশমী ও দশেরা উদযাপনের সবথেকে প্রধান এবং কেন্দ্রীয় মিলনক্ষেত্র।
রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের মাটিতে দাঁড়িয়ে খোদ নওয়াজ শরিফের উদ্যোগে হিন্দু ও শিখ ঐতিহ্যকে এভাবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া এবং ইসলামিক নাম বদলে পুরনো নাম ফিরিয়ে আনার এই কৌশল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের একটি ‘উদারপন্থী’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছে নওয়াজের দল, যা আগামী দিনে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সাহায্য ও পর্যটনকে আকর্ষণ করতে বড় ভূমিকা নিতে পারে।