এবার ‘থ্রি-ডি’ অ্যাকশন প্ল্যান! সিএএ নিয়ে নবান্ন থেকে শুভেন্দু সরকারের মেগা ঘোষণা

পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক অলিন্দ নবান্ন সভাঘর থেকে রাজ্য তথা জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থে এবার সবথেকে বড় ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একদিকে যখন রাজ্য জুড়ে মাফিয়াদের ডেরায় বুলডোজার অভিযান চলছে এবং সমস্ত ধর্মীয় ভাতা বন্ধ করে ‘বিবেকানন্দ স্কলারশিপ’ চালুর মতো মেগা সংস্কারের পথে হাঁটছে নতুন সরকার, ঠিক তখনই সীমান্ত সুরক্ষা ও নাগরিকত্ব আইন নিয়ে এক চরম কড়া অবস্থানের কথা স্পষ্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী।

নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশ থেকে হওয়া বেআইনি অনুপ্রবেশ রুখতে এবং রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আজ থেকেই বাংলায় কার্যকর হচ্ছে ‘থ্রি-ডি’ (3D) ব্যবস্থা— অর্থাৎ ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ (Detect, Delete, Deport)।

সিএএ-তে আবেদন বাধ্যতামূলক, অন্যথায় সরাসরি গ্রেফতার

কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) প্রসিডিউরকে এ রাজ্যে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আইনি বার্তা দেন। তিনি জানান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ‘সংখ্যালঘু’ শরণার্থীদের নাগরিকত্ব সুনিশ্চিত করতেই সিএএ এনেছে কেন্দ্র। নতুন নিয়মের প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী বলেন:

  • আবেদন বাধ্যতামূলক: উল্লিখিত তিন প্রতিবেশী দেশ থেকে গত ৩১শে ডিসেম্বর ২০২৪-এর মধ্যে এ রাজ্যে আসা নির্দিষ্ট সাতটি সম্প্রদায়ের মানুষকে ভারতের বৈধ নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য সিএএ পোর্টালে আবেদন করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক।
  • আইনি সুরক্ষা: যাঁরা সিএএ-র নিয়মানুযায়ী আবেদন করবেন বা এর অন্তর্ভুক্ত হবেন, তাঁদের রাজ্যের কোনো পুলিশ বা প্রশাসন কোনোভাবেই কোথাও কোনো হেনস্থা বা আটক করতে পারবে না।

তবে এর পাশাপাশি যারা এই আইনের পরিধির বাইরে থাকবে, তাঁদের জন্য চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী সাফ জানান, “সিএএ-র আওতার বাইরে যাঁরা এ রাজ্যে রয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। তাঁদের সরাসরি রাজ্য পুলিশ গ্রেফতার ও আটক করবে। সিএএ-তে আবেদন না করলে কড়া আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে।”

বিগত সরকারের উদাসীনতাকে তোপ, বিএসএফ-এর সাথে সমন্বয়

বিগত তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ শাণিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একটি গোপন চিঠি ও কেন্দ্রের পূর্ববর্তী নির্দেশিকার কথা জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন:

“বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে সরাসরি সীমান্তরক্ষা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য এক বছরেরও বেশি সময় আগে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এই রাজ্যকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আগের সরকার একদিকে যেমন শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সিএএ-র অন্ধ বিরোধিতা করেছে, অন্যদিকে অনুপ্রবেশ রোখার এই অত্যন্ত জরুরি আইনি নির্দেশিকাকে সম্পূর্ণ চেপে রেখেছিল। দেশের এবং পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে আজ থেকে আমরা এই থ্রি-ডি আইন কার্যকর করলাম।”

থানাগুলিতে হাই-অ্যালার্ট, কীভাবে কাজ করবে ‘থ্রি-ডি’ ব্যবস্থা?

নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত লাগোয়া সমস্ত জেলা ও থানাগুলিতে এই আইন আজ থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বলবৎ করা হয়েছে। রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা ও স্থানীয় আধিকারিকদের নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিশেষ ‘থ্রি-ডি’ অ্যাকশন প্ল্যানের কার্যপদ্ধতি নিম্নরূপ:

পর্যায় (Phase)প্রশাসনিক পদক্ষেপ (Action)
১. ডিটেক্ট (Detect)সীমান্ত অঞ্চল ও রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা।
২. ডিলিট (Delete)অবৈধভাবে তৈরি হওয়া ভোটার তালিকা বা অন্যান্য সরকারি নথি থেকে তাঁদের নাম সম্পূর্ণ মুছে ফেলা।
৩. ডিপোর্ট (Deport)গ্রেফতারের পর তাঁদের সরাসরি বিএসএফ-এর কাছে হস্তান্তর করা এবং বিএসএফ বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ (BGB)-এর সাথে কথা বলে তাঁদের নিজেদের দেশে ফেরত বা ডিপোর্ট করার ব্যবস্থা করবে।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন বিএসএফ-কে সীমান্ত জমি হস্তান্তরের ঐতিহাসিক ছাড়পত্র দিয়েছে নবান্ন, ঠিক তখনই অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে শুভেন্দু সরকারের এই অল-আউট ‘থ্রি-ডি’ ক্র্যাকডাউন সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলির জনবিন্যাস এবং জাতীয় সুরক্ষার সমীকরণকে এক ধাক্কায় আমূল বদলে দিতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *