বিনিয়োগের জোয়ার ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সফল মোদির পাঁচ দেশ সফর

বিনিয়োগের জোয়ার ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সফল মোদির পাঁচ দেশ সফর

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হরমুজ প্রণালীতে চলমান সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, ঠিক তখনই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফর শেষ করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (ইউএই), নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে এবং ইটালি—এই পাঁচ দেশের সফরকে কেবল সাধারণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হিসেবে দেখছেন না ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞরা। এটি মূলত হরমুজ সংকটের আবহে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রযুক্তিগত অবস্থানকে শক্তিশালী করার একটি সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ।

প্রধানমন্ত্রীর এই ঝটিকা সফরে ভারতের জন্য প্রায় ৪০ কোটি মার্কিন ডলারের সরাসরি বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর, লজিস্টিকস, পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তির মতো খাতের ৫০টিরও বেশি বহুজাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন মোদি। সম্মিলিতভাবে ২.৭ থেকে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যের এই সংস্থাগুলোর অনেকেই ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে দেশটিতে তাদের ব্যবসার পরিধি আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যে মজবুত পরিকাঠামো

সফরের প্রথম পর্যায়ে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর সাথে ভারতের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতার কথা মাথায় রেখে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই চুক্তিগুলো বড় ভূমিকা রাখবে। এর অধীনে আমিরশাহী ভারতকে এলপিজি সরবরাহ করবে এবং পেট্রোলিয়াম মজুত রাখার বিষয়ে দুই দেশ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব এবং গুজরাটের ভাদিনারে একটি সামুদ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পও এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি, ভারতের পরিকাঠামো ও আর্থিক খাতে ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমিরশাহী।

ইউরোপীয় প্রযুক্তি ও ভারতের উৎপাদন ক্ষমতার মেলবন্ধন

নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবার কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের সাথে বাণিজ্য, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং গ্রিন হাইড্রোজেন নিয়ে মোট ১৭টি চুক্তি হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য ইউরোপীয় উচ্চপ্রযুক্তি এবং ভারতের বিশাল উৎপাদন ক্ষমতাকে একত্রিত করে বিশ্ব সাপ্লাই চেইনে ভারতের অবস্থানকে অজেয় করে তোলা। অন্যদিকে নরওয়েতে অনুষ্ঠিত ভারত-নর্ডিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে সবুজ শক্তি, আর্কটিক সহযোগিতা ও জলবায়ু মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের রূপরেখা তৈরি করেছে ভারত।

তবে কূটনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে বড় সাফল্য এসেছে ইটালি সফরে। ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সাথে আলোচনার পর প্রতিরক্ষা, বিরল খনিজ, উচ্চশিক্ষা, সামুদ্রিক সহযোগিতা এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যা ইউরোপের বাজারে ভারতের অংশীদারিত্ব আরও দৃঢ় করবে। বিশ্বব্যাপী যখন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে, তখন এই পাঁচ দেশীয় সফর ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সচল রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশটির নির্ভরযোগ্যতা অনেকটাই বাড়িয়ে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *