পণ, হত্যা নাকি আত্মহত্যা? বিয়ের পর কেন শেষ হয়ে যাচ্ছে ভারতের নতুন বউদের জীবন?

পণ, হত্যা নাকি আত্মহত্যা? বিয়ের পর কেন শেষ হয়ে যাচ্ছে ভারতের নতুন বউদের জীবন?

হতাশা নাকি সামাজিক অপরাধ, ভারতে কেন বাড়ছে নববধূদের সন্দেহজনক মৃত্যু

ভারতে বিগত মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন ও নববধূদের রহস্যজনক মৃত্যুর একাধিক ঘটনা নতুন করে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও ওড়িশার মতো বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা এসব ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও অভিযোগের ধরন একই। কোথাও আত্মহত্যার প্ররোচনা, কোথাও ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া, আবার কোথাও প্রমাণ লোপাটের জন্য তড়িঘড়ি মরদেহ মাটিচাপা দেওয়ার মতো নৃশংসতা সামনে এসেছে। ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর (NCRB) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২৪ সালে দেশটিতে ৫,৭৩৭টি যৌতুকজনিত মৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে উত্তর প্রদেশে সর্বোচ্চ ২,০৩৮টি এবং বিহারে ১,০৭৮টি ঘটনা ঘটেছে। দিল্লি বা গ্রেটার নয়ডার মতো আধুনিক নগরীগুলোতেও এই প্রবণতা সমানভাবে দৃশ্যমান হওয়ায় এটি স্পষ্ট যে, এই ব্যাধি কেবল গ্রামীণ বা অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

অভিযোগের ধরণ ও সামাজিক রূপান্তর

আইনজীবী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক ভারতে যৌতুকের সনাতনী রূপ বদলে এখন তা ‘উপহার’, ‘পারিবারিক মর্যাদা’ কিংবা ‘ব্যবসায়িক সহায়তা’র মোড়কে দাবি করা হচ্ছে। বিয়ের পরও গাড়ি, ফ্ল্যাট বা মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে নারীদের ওপর ক্রমাগত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদার হানি ও লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগী নারীদের পরিবার তাঁদের ফিরিয়ে না নিয়ে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। এই ধারাবাহিক মানসিক চাপই অনেককে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে অথবা তাঁদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পুরুষদের উচ্চ বেতনের চাকরির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌতুকের চাহিদাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে কন্যাসন্তানকে বোঝা এবং পুত্রসন্তানকে সম্পদ ভাবার মানসিকতাই মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।

আইনি জটিলতা ও সম্ভাব্য প্রভাব

ভারতে ১৯৬১ সালের যৌতুক বিরোধী আইনের পাশাপাশি বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারা ৮০ (পূর্বতন আইপিসির ৩০৪বি) অনুযায়ী বিয়ের সাত বছরের মধ্যে নারীর সন্দেহজনক মৃত্যু ও যৌতুক নির্যাতনের প্রমাণ মিললে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। ঘরের ভেতরের নির্যাতনের অকাট্য তথ্যপ্রমাণ জোগাড়ের অভাব, আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এবং সামাজিক চাপে শেষ মুহূর্তে সাক্ষীদের পিছিয়ে আসার কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। এর ফলে সমাজে আইনি ভীতি হ্রাস পাচ্ছে এবং নারীদের সার্বিক নিরাপত্তা ও লিঙ্গ সমতার সূচক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এক ঝলকে

  • ভারতে গত দুই সপ্তাহে কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে যৌতুকের দাবিতে একাধিক নববধূর সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
  • ২০২৪ সালে দেশটিতে মোট ৫,৭৩৭টি যৌতুকজনিত মৃত্যুর মামলা রেকর্ড করা হয়েছে, যার শীর্ষে রয়েছে উত্তর প্রদেশ ও বিহার।
  • আধুনিক সময়ে নগদ অর্থ বা গহনার বাইরে গাড়ি, ফ্ল্যাট ও ব্যবসার পুঁজির দাবিতে নির্যাতনের আধুনিক রূপান্তর ঘটেছে।
  • কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অকাট্য প্রমাণের অভাব এবং সামাজিক সমঝোতার কারণে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার হার অত্যন্ত কম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *