ডিভোর্সের আগে মায়ের নামে সম্পত্তি? স্ত্রীকে ফাঁকি দেওয়ার ছক রুখবে আইন—জেনে নিন আসল নিয়ম!

ডিভোর্সের আগে মায়ের নামে সম্পত্তি? স্ত্রীকে ফাঁকি দেওয়ার ছক রুখবে আইন—জেনে নিন আসল নিয়ম!

দাম্পত্যের টানাপোড়েন যখন আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই সম্পত্তির ভাগাভাগি এড়াতে এক পক্ষ চতুরতার আশ্রয় নেয়। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এক নারী আদালতের চত্বরেই তার প্রাক্তন স্বামীর ওপর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। ওই নারীর অভিযোগ, বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করার ঠিক কয়েক দিন আগে স্বামী তার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং ব্যাংক ব্যালেন্স নিজের মায়ের নামে হস্তান্তর করেছেন। উদ্দেশ্য একটাই—আইনত স্ত্রীকে যেন কোনো খোরপোশ বা সম্পত্তির অংশ দিতে না হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মায়ের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেই কি আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব? ভারতীয় বিচার সংহিতা (BNS) এবং হিন্দু বিবাহ আইন অনুযায়ী এই কৌশল আসলে খুব একটা কার্যকর নয়।

আইন ফাঁকি দেওয়া কি এতই সহজ?

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলাকালীন বা তার ঠিক আগে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করাকে আদালত ‘মালাফাইড ইনটেনশন’ বা অসাধু উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য করে। ১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইনের ২৪ এবং ২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, স্ত্রীর ভরণপোষণ বা খোরপোশ পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। স্বামী যদি দাবি করেন যে তার নামে কোনো সম্পত্তি নেই, তবুও আদালত তার জীবনযাত্রার মান এবং অতীতের আর্থিক রেকর্ড খতিয়ে দেখার ক্ষমতা রাখে। এমনকি স্বামী যদি সম্পত্তি দান বা বিক্রি করে দেন, তবুও তার উপার্জন করার সক্ষমতা বা কাল্পনিক আয়ের ওপর ভিত্তি করে আদালত খোরপোশ নির্ধারণ করতে পারে।

ভারতীয় বিচার সংহিতা (BNS) ও সুপ্রিম কোর্টের কড়া অবস্থান

নতুন ভারতীয় বিচার সংহিতার ৩১৬ ধারা অনুযায়ী, যদি যৌথ সম্পত্তিতে স্ত্রীর স্বার্থ থাকে এবং স্বামী তা প্রতারণামূলকভাবে হস্তান্তর করেন, তবে তা ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ’ হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া ৩১৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, আইনি দায়বদ্ধতা থেকে বাঁচতে তথ্য গোপন করা জালিয়াতির শামিল।

২০২০ সালে ‘রজনীশ বনাম নেহা’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, স্বামী ও স্ত্রী উভয়কেই তাদের সম্পত্তি এবং আয়ের পূর্ণ বিবরণ সম্বলিত হলফনামা জমা দিতে হবে। পারিবারিক বিবাদ শুরুর পর যদি কোনো ‘গিফট ডিড’ বা দানপত্র তৈরি করা হয়, তবে আদালত সেটিকে অত্যন্ত সন্দেহের চোখে দেখে। বিচারক চাইলে সেই হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে অবৈধ বা বাতিল ঘোষণা করার এখতিয়ারও রাখেন।

স্ত্রীর আইনি সুরক্ষা ও অধিকার

যেকোনো আইনি লড়াইয়ে স্বামীর এই ধরনের চালাকি হিতে বিপরীত হতে পারে। আদালত যদি বুঝতে পারে যে সম্পত্তি হস্তান্তর কেবল স্ত্রীকে বঞ্চিত করার জন্য করা হয়েছে, তবে সেটিকে একটি ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া ‘শেয়ারড হাউসহোল্ড’ বা যৌথ আবাসের অধিকার অনুযায়ী, বাড়িটি যদি স্বামীর বদলে শাশুড়ির নামেও থাকে, তবুও পারিবারিক সহিংসতা আইনের অধীনে স্ত্রী সেখানে বসবাসের অধিকার দাবি করতে পারেন। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতেও স্বামীর অংশ থেকে স্ত্রীর পাওনা নিশ্চিত করার পথ খোলা রাখে দেশের প্রচলিত আইন। দিনশেষে কাগজের কারসাজিতে নয়, বরং বাস্তব আর্থিক অবস্থার বিচারেই আদালত তার চূড়ান্ত রায় প্রদান করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *