হিটওয়েভ থেকে বাঁচতে চিনি মেশানো দুধের পরামর্শ, আয়ুষ মন্ত্রকের নয়া সুপারিশ ঘিরে তুমুল চর্চা

দেশজুড়ে পারদ ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী, আর তার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ। এই অতিরিক্ত গরমে ডিহাইড্রেশন, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, পেশিতে টান, মাথাব্যথা ও গ্যাস্ট্রিকের মতো নানাবিধ শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, মহিলা, প্রবীণ নাগরিক এবং যাঁরা রোদে দীর্ঘক্ষণ কাজ করেন, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে তাপজনিত অসুস্থতা এড়াতে কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ মন্ত্রক একটি জনস্বাস্থ্য নির্দেশিকা জারি করেছে। তবে সেই নির্দেশিকায় তীব্র গরমের মোকাবিলা করতে দুধের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে খাওয়ার যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা নিয়েই এখন চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মধ্যে শোরগোল পড়ে গেছে।
আয়ুর্বেদিক ভিত্তি ও আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
সাধারণত চিকিৎসকেরা অতিরিক্ত চিনি খাওয়া এড়াতে বললেও, আয়ুষ মন্ত্রকের এই পরামর্শের পেছনে প্রাচীন আয়ুর্বেদ ও আধুনিক বিজ্ঞান— উভয়েরই কিছু যুক্তি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পুষ্টিবিদ দীপ্তা নাগপালের মতে, আয়ুর্বেদে দুধকে ‘শীতল’ বা ঠান্ডা খাবার হিসেবে গণ্য করা হয়, যা শরীরের অতিরিক্ত পিত্ত বা তাপ কমাতে সাহায্য করে। এর সঙ্গে চিনি (বিশেষ করে মিছরি বা অপরিশোধিত চিনি) মেশালে শরীর আরও ঠান্ডা হয়। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, দুধে প্রায় ৮৭ শতাংশ জল থাকে এবং এতে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট রয়েছে, যা ঘামের সাথে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে, চিনিতে থাকা গ্লুকোজ অন্ত্রে সোডিয়াম ও জল দ্রুত শোষণে সাহায্য করে, যা ওআরএস (ORS) কাজ করার পদ্ধতির মতোই। মধুকর রেইনবো চিলড্রেনস হাসপাতালের ডা. সমীক্ষা কালরা জানান, ঠান্ডা দুধ ও চিনির এই মিশ্রণটি রোদে খেলাধুলা করা শিশু এবং গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্লান্তি দূর করে দ্রুত শক্তি জোগাতে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।
সতর্কবার্তা: এটি কি সবার জন্য উপযোগী?
উপকারী হলেও এই পানীয় সবার জন্য মোটেও উপযোগী নয় বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকেরা। ডা. কালরার মতে, ডায়াবেটিস, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, পিসিওএস (PCOS), স্থূলতা বা হজমের সমস্যায় আক্রান্ত মহিলাদের অতিরিক্ত চিনিযুক্ত এই পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত। আবার যাঁদের ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা (Lactose intolerance), আইবিএস (IBS) বা পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে দুধ খেলে পেট ফাঁপা বা ডায়রিয়া হতে পারে, যা শরীরকে আরও বেশি ডিহাইড্রেটেড করে তুলবে। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, চিনি মেশানো দুধ কোনোভাবেই জল বা ওআরএস-এর বিকল্প নয়। গুরুতর ডিহাইড্রেশনের ক্ষেত্রে ডাবের জল, নুন-লেবুর শরবত বা ঘোল অনেক বেশি কার্যকরী।
এক ঝলকে
- তীব্র তাপপ্রবাহ ও ডিহাইড্রেশনের মোকাবিলা করতে দুধের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে খাওয়ার বিতর্কিত পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় আয়ুষ মন্ত্রক।
- বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, দুধে থাকা ৮৭% জল ও ইলেকট্রোলাইট এবং চিনির গ্লুকোজ শরীরকে দ্রুত শক্তি দিতে এবং জলীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে সাময়িকভাবে সাহায্য করে।
- ডায়াবেটিস, ওবেসিটি, আইবিএস এবং ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এই পানীয় উল্টো বিপত্তি ডেকে আনতে পারে।
- চিকিৎসকদের মতে, এই ঘরোয়া টোটকাটি সুস্থ মানুষের জন্য আরামদায়ক হলেও তা কখনই ওআরএস (ORS), ডাবের জল বা পর্যাপ্ত পরিশ্রুত পানীয় জলের বিকল্প নয়।