ফুটন্ত খাবার খেয়েই ঠান্ডা জল পান, মহিলার গলার ভিতর যা ঘটল দেখে থমকে গেলেন চিকিৎসকরাও!

গরম হটপট খেয়েই বরফ জল! চিনের মহিলার খাদ্যনালীতে ৮ সেন্টিমিটারের মারাত্মক ক্ষত
গরম গরম খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো বা আরামদায়ক বলে মনে করা হলেও, অতিরিক্ত গরম খাবার দ্রুত খাওয়ার অভ্যাস যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা প্রমাণ করল চিনের একটি শিউরে ওঠা ঘটনা। চিনের হুনান প্রদেশের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী এক মহিলা ফুটন্ত হটপট (Hotpot) থেকে অত্যন্ত গরম খাবার চিবিয়ে দ্রুত গিলে ফেলার কারণে তাঁর খাদ্যনালীতে (Esophagus) প্রায় ৮ সেন্টিমিটার দীর্ঘ এক মারাত্মক আলসার বা ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
তীব্র জ্বলন এবং বরফ জলের ভুল সিদ্ধান্ত
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই মহিলা নিজের বন্ধুদের সাথে একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া করছিলেন। টেবিলে ফুটতে থাকা হটপট থেকে অত্যন্ত গরম খাবার তিনি চটজলদি খেয়ে নেন। খাওয়ার পরপরই তাঁর বুকে তীব্র ব্যথা এবং গলায় প্রচণ্ড জ্বলন অনুভূত হতে শুরু করে। সেই অস্বস্তি সাময়িক ভেবে এবং দ্রুত উপশম পেতে তিনি সাথে সাথে ফ্রিজের কনকনে ঠাণ্ডা বরফ জল (Ice-cold water) খেয়ে নেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। রাতের দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে এবং পরের দিন সকালে তিনি ঢোক গিলতে বা সামান্য জলটুকুও পান করতে পারছিলেন না। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিনি হাসপাতালে ছোটেন।
খাদ্যনালীর এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে ক্ষত
হাসপাতালে চিকিৎসকেরা ওই মহিলার এন্ডোস্কোপি (Endoscopy) করার পর রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে যান। দেখা যায়, তাঁর খাদ্যনালীতে ৮ সেন্টিমিটার লম্বা একটি বিশাল ক্ষত বা থার্মাল আলসার তৈরি হয়েছে, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্পূর্ণ খাদ্যনালীর দৈর্ঘ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির চিকিৎসকেরা জানান, সাধারণ মানুষের ধারণা গলা বা মুখ অনেক বেশি উত্তাপ সহ্য করতে পারে, কিন্তু আমাদের খাদ্যনালীর ভেতরের পাতলা শ্লেষ্মা ঝিল্লি বা মিউকোসা স্তর মাত্র ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। অন্যদিকে, ফুটন্ত হটপটের খাবারের তাপমাত্রা প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে, যা খাদ্যনালীর ভেতরের নরম চামড়াকে মারাত্মকভাবে পুড়িয়ে (Severe Burns) দেয়।
চিকিৎসকদের জরুরি সতর্কবার্তা ও ক্যান্সারের ঝুঁকি
এই ঘটনার পর চিকিৎসকেরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক পরামর্শ দিয়েছেন:
- বরফ জলের মারাত্মক ক্ষতি: গরম খাবার খেয়ে পুড়ে যাওয়ার পর তৎক্ষণাৎ বরফ জল খেলে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ বা কলার কোনো উপশম হয় না; বরং হঠাৎ তাপমাত্রার চরম পরিবর্তনের ফলে (Thermal Shock) ভেতরের চামড়া আরও বেশি সংকুচিত ও বিরক্ত (Irritation) হয়ে ক্ষতকে গভীর করে তোলে।
- ক্যান্সারের ঝুঁকি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র ক্যান্সার গবেষণা বিভাগের মতে, ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার যেকোনো খাবার বা পানীয় মানবদেহে ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী উপাদান বা ‘কার্সিনোজেন’ (Carcinogen) হিসেবে কাজ করতে পারে।
- পরিসংখ্যান: বিশ্বজুড়ে খাদ্যনালীর ক্যান্সারের (Esophageal Cancer) মোট মামলার প্রায় ৪০ শতাংশই চিনে নথিভুক্ত হয়। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরম খাবার এবং ফুটন্ত চা-কফি পানের অভ্যাসই এর প্রধান কারণ। তাই “খাবার ধোঁয়া ওঠা গরম অবস্থাতেই খেতে হবে”— এই পুরনো ও অস্বাস্থ্যকর ধারণা বদলে খাবার কিছুটা ঠাণ্ডা করে খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এক ঝলকে
- চিনের হুনান প্রদেশে ফুটন্ত হটপটের খাবার দ্রুত খেয়ে ফেলায় এক মহিলার খাদ্যনালীতে ৮ সেমি দীর্ঘ ক্ষত বা আলসার তৈরি হলো।
- গরমের অস্বস্তি কমাতে সঙ্গে সঙ্গে বরফ জল খাওয়ায় থার্মাল শকের কারণে খাদ্যনালীর ভেতরের চামড়া আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- চিকিৎসকদের মতে, খাদ্যনালীর ত্বক সর্বোচ্চ ৫০-৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সইতে পারে, অথচ হটপটের তাপমাত্রা ছিল ৮০-৯০ ডিগ্রি।
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, ৬৫ ডিগ্রির বেশি গরম খাবার বা পানীয় নিয়মিত গ্রহণ করলে খাদ্যনালীতে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।