৪৬০০ বছরের ঝড়-ঝাপ্টাতেও অক্ষত গিজার গ্রেট পিরামিড, নেপথ্যে থাকা জাদুকরি বিজ্ঞানের নতুন হদিস!

কালের নিয়মে মিশরের সমসাময়িক সব প্রাচীন কীর্তি ধুলোয় মিশে গেলেও সাড়ে চার হাজার বছর ধরে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গিজা শহরের ‘গ্রেট পিরামিড’। ফারাও খুফুর সমাধিস্থলে নির্মিত ৪৮১ ফুট উচ্চতার এই প্রকাণ্ড কাঠামোটিকে বহু শতাব্দী ধরে কোনো ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ টলাতে পারেনি। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের একটি নতুন গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে এই পিরামিড টিকে থাকার নেপথ্যে থাকা এক পরম বিস্ময়কর প্রকৌশলগত রহস্য।
ধ্বংসস্তূপের মাঝে ব্যতিক্রমী এক সৃষ্টি
২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রায় ২৩ লক্ষ পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি এই পিরামিডের মোট ওজন প্রায় ৬০ লক্ষ মেট্রিক টন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মিশরের প্রাচীন মেইডাম পিরামিডের বহিরঙ্গ ধসে পড়েছে এবং ইউজারকাফ বা উনাসের মতো পিরামিডগুলি আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এমনকি মেক্সিকো বা গুয়াতেমালার পিরামিডগুলোও ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। সেই তুলনায় গিজার পিরামিড সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। যদিও ১৮৪৭ এবং ১৯৯২ সালে গিজার অদূরে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল, যার ফলে পিরামিডের ওপরের কিছু পাথর সামান্য খসে পড়েছিল, কিন্তু মূল কাঠামোর কোনো ক্ষতি করা সম্ভব হয়নি।
কম্পন রোধের গোপন বিজ্ঞান
মিশরের ‘ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড জিয়োফিজিক্স’-এর ভূকম্পবিদ আসেম সালামারের নেতৃত্বে একদল গবেষক পিরামিডের অন্দরে ও চারপাশে ৩৭টি বিশেষ সেন্সর বসিয়ে এই রহস্যের জট খুলেছেন। ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ পত্রিকায় প্রকাশিত সেই গবেষণায় দেখা গেছে, পারিপার্শ্বিক ভূমি থেকে আসা সাধারণ কম্পাঙ্ক যেখানে ০.৬ হার্টজ, সেখানে পিরামিডের ভেতরের বেশির ভাগ অংশের নিজস্ব কম্পাঙ্ক ২.০ থেকে ২.৬ হার্টজ।
ভূমি এবং মূল কাঠামোর এই কম্পাঙ্কের পার্থক্যের কারণেই ভূমিকম্পের ক্ষতিকর অনুরণন বা রেজোন্যান্স পিরামিডের ভেতরে ছড়াতে পারে না। ফলে বড় ধরনের কম্পনেও এর ভিত নড়ে না।
অজান্তেই গড়া আশ্চর্য বর্ম
গবেষকদের দাবি, পিরামিডের ভেতরে ফারাও ও তাঁর স্ত্রীর কক্ষের ওপরে যে ফাঁপা ‘চাপ প্রশমনকারী কক্ষ’ বা ঘরগুলো রয়েছে, সেগুলোই মূলত ভূমিকম্পের তীব্রতা হ্রাস করে দেয়। পিরামিড নির্মাণকারীরা মূলত ওপরের পাথরের বিপুল ভার লাঘব করার জন্যই এই ফাঁপা কক্ষগুলো তৈরি করেছিলেন। তবে অজান্তেই এই নকশাটি পুরো কাঠামোর জন্য একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প প্রতিরোধক বর্ম হিসেবে কাজ শুরু করে। প্রাচীনকালের প্রকৌশলীরা সচেতনভাবে এই ভূকম্পন রোধের বিদ্যা জানতেন কি না তা স্পষ্ট নয়, তবে তাঁদের সেই কৌশলী নির্মাণশৈলীই আজ ৪৬০০ বছর ধরে গিজার পিরামিডকে পৃথিবীর বুকে অপরাজেয় করে রেখেছে।