পালাবদলে টালমাটাল টলিপাড়া, পদ ছাড়তে নারাজ পিয়া, মধ্যরাতে সোজা থানায়!

পালাবদলে টালমাটাল টলিপাড়া, পদ ছাড়তে নারাজ পিয়া, মধ্যরাতে সোজা থানায়!

ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবার তীব্র উত্তেজনা ছড়াল টলিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশন’ বা ইম্পায় (EIMPA)। গত ৪ মে রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের অন্দরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা শুক্রবারের বৈঠকে চূড়ান্ত রূপ নেয়। ইম্পার সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তকে পদ থেকে সরানোর দাবি এবং তার পাল্টা প্রতিরোধকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে।

শুক্রবার ইম্পার সদর দপ্তরে আয়োজিত একটি সাধারণ বৈঠককে কেন্দ্র করে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। নির্বাচনের পর থেকেই প্রযোজক ও পরিবেশকদের একাংশ বর্তমান সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও চেয়ার আঁকড়ে থাকার অভিযোগ তুলে আসছিলেন। এদিনের বৈঠকে বিরোধী শিবিরের প্রযোজকদের মুখ শতদীপ সাহা দাবি করেন, নতুন সরকার গঠনের মাত্র ১৮ দিনের মাথায় ধ্বনিভোটের মাধ্যমে পিয়া সেনগুপ্তকে সভাপতি পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে এবং রতন সাহাকে অস্থায়ী সভাপতি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন বর্তমান সভাপতি।

বৈঠকে ধুন্ধুমার ও থানায় লিখিত অভিযোগ

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, বৈঠক চলাকালীন দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ক্ষুব্ধ সভাপতি ফাইল হাতে মাঝপথেই সভা ত্যাগ করেন। পিয়া সেনগুপ্তের অভিযোগ, বৈঠক কক্ষে বহিরাগতদের প্রবেশ ঘটানো হয়েছিল এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই তাঁর দিকে আক্রমণাত্মকভাবে তেড়ে আসা হয়। এমনকি তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত অভদ্র আচরণ ও শ্লীলতাহানি করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং সাময়িকভাবে স্থগিত থাকার পর পুলিশি পাহারায় আবারও বৈঠক শুরু হয়।

এই নজিরবিহীন ঘটনার পর ইম্পা সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত তীব্র মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতা বোধ করেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে তিনি ‘প্যানিক অ্যাটাক’-এর শিকার হয়েছেন এবং তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল থেকে কিছুটা সুস্থ বোধ করার পর, শুক্রবার গভীর রাতেই পিয়া সেনগুপ্ত এবং বিরোধী পক্ষের শতদীপ সাহা দুজনেই বৌবাজার থানায় হাজির হন। পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়ে উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে থানায় लिखित অভিযোগ দায়ের করেছেন।

রাজনৈতিক পালাবদল ও রূপান্তরের প্রভাব

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, টলিউডের এই নজিরবিহীন অস্থিরতার মূল কারণ রাজ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়া। ২০১১ সাল থেকেই বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবের এক নিবিড় যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল, যা নতুন সরকার গঠনের পর এখন পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইম্পার এই ক্ষমতার লড়াই মূলত টলিপাড়ার নিয়ন্ত্রণভার নিজেদের হাতে নেওয়ার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক চেষ্টারই বহিঃপ্রকাশ।

সংগঠনের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে বাংলা চলচ্চিত্র পরিবেশনা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তা নতুন সিনেমা মুক্তি এবং ইন্ডাস্ট্রির সামগ্রিক ব্যাবসায়িক কাঠামোর ক্ষতি করতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তিনি এই পদচ্যুতি মানেন না এবং সামগ্রিক বিষয়টি তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দৃষ্টিগোচরে আনবেন। ফলে টলিপাড়ার এই আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই আগামী দিনগুলোতে আরও জটিল রূপ নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *