পাপ্পু-কাণ্ডে এবার কোপ প্রাক্তন পুলিশকর্তা শান্তনুর কান্দির প্রাসাদে, একদিনেই বিপুল সোনা উদ্ধার ইডির

কসবার কুখ্যাত ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুর আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলায় আরও কোণঠাসা কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) শান্তনু সিংহ বিশ্বাস। মুর্শিদাবাদের কান্দিতে অবস্থিত এই প্রাক্তন পুলিশকর্তার পৈতৃক বাড়িটি এবার বাজেয়াপ্ত করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে ইনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। শুক্রবার দিনভর কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ম্যারাথন তল্লাশি চালিয়ে প্রায় দু’কেজি সোনা ও বিপুল নগদ টাকা উদ্ধার করেছেন কেন্দ্রীয় আধিকারিকেরা। একসময়ের প্রভাবশালী এই পুলিশকর্তার বিপুল সম্পত্তির উৎস সন্ধানে নেমে তদন্তকারীরা এখন একের পর এক বিস্ফোরক তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।
ভগ্নপ্রায় বাড়ি থেকে রাতারাতি প্রাসাদ
তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, কান্দি পুরসভার আট নম্বর ওয়ার্ডে শান্তনুর পৈতৃক বাড়িটি দীর্ঘদিন ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পড়ে ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে রাতারাতি সেই ভোলবদল হয়ে তা এক বিশাল ‘প্রাসাদোপম’ অট্টালিকায় পরিণত হয়। শুক্রবার ভোরে ইডির একটি দল সেখানে পৌঁছালে বাড়িটি তালাবন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর, অবশেষে তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন আধিকারিকেরা। ওই বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে সম্পত্তির বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করা হয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করেই বাড়িটি বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইডি। উল্লেখ্য, শান্তনুর বোন গৌরী সিংহ বিশ্বাস স্থানীয় তৃণমূল পরিচালিত পুরসভার সহকারী পুরপ্রধান হওয়ায়, এই বিপুল সম্পত্তির পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে।
কলকাতা জুড়ে সাঁড়াশি অভিযান ও কোটি টাকার সোনা উদ্ধার
সোনা পাপ্পু মামলার জাল কতদূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে শুক্রবার শুধু কান্দি নয়, কলকাতার কসবা, চক্রবেড়িয়া ও রয়েড স্ট্রিটসহ মোট নয়টি জায়গায় একযোগে সাঁড়াশি অভিযান চালায় ইডি। এর মধ্যে কসবায় কলকাতা পুলিশের এক সাব ইনস্পেক্টরের (এসআই) বাড়ি এবং চক্রবেড়িয়ায় অতুল কাটারিয়া নামে এক ব্যবসায়ীর ঠিকানাও ছিল।
দিনভরের এই অভিযানে প্রায় দু’কেজি সোনা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক তিন কোটি টাকার কাছাকাছি। এর পাশাপাশি নগদ ১০ লক্ষ টাকা, বেশ কয়েকটি মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল নথি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তদন্তকারীদের দাবি, তল্লাশির আগেই মোবাইল ফোনগুলো থেকে অধিকাংশ চ্যাট ও তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে, যা ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা চলছে।
সিন্ডিকেট রাজ ও প্রভাবশালীদের যোগসূত্র
মূল অভিযুক্ত সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে ভয় দেখিয়ে ও ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে সাধারণ মানুষের জমি ও সম্পত্তি কম দামে হস্তগত করার অভিযোগ রয়েছে। আদালতে ইডি জানিয়েছে, এই জমি সিন্ডিকেটের পেছনে একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয় ছিল, যার অন্যতম অংশীদার ছিলেন বেহালার ব্যবসায়ী জয় কামদার এবং প্রাক্তন পুলিশকর্তা শান্তনু সিংহ বিশ্বাস। পুলিশের শীর্ষ পদে থাকার সুবাদে শান্তনু এই সিন্ডিকেটকে আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা দিতেন এবং বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। এই প্রভাবশালী চক্রের শিকড় আরও গভীরে ছড়িয়ে রয়েছে বলে অনুমান করছেন তদন্তকারীরা।