চিঠিও নেই, অফিসিয়াল বার্তাও নেই! মোদীকে হোয়াইট হাউসের আমন্ত্রণ কি শুধুই জল্পনা?

হোয়াইট হাউসে মোদীর আমন্ত্রণ কি শুধুই জল্পনা, নেপথ্যে আমেরিকার কোন চাল
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণ এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক ভারত সফর ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই আমন্ত্রণের সত্যতা এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার (প্রোটোকল) নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন ভারতের সাবেক প্রবীণ কূটনীতিক বীনা সিকরি। তাঁর দাবি, কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা বার্তাহীন এই অনানুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ আন্তর্জাতিক রীতিনীতির বাইরে। ধারণা করা হচ্ছে, চীন সফরের পর আমেরিকার এমন আকস্মিক ‘কোয়াড প্রীতি’ এবং ভারতকে আমন্ত্রণের পেছনে ওয়াশিংটনের কোনো সুদূরপ্রসারী কৌশলগত চাল লুকিয়ে থাকতে পারে।
আমন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক প্রোটোকল সংকট
সাবেক এই কূটনীতিকের মতে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমন্ত্রণের কথা জানালেও এর কোনো দাপ্তরিক ভিত্তি বা আনুষ্ঠানিক চিঠি এখনো মেলেনি। ফলে আমন্ত্রণের প্রকৃত মর্যাদা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। আগামী মাসে জি-৭ বৈঠক কিংবা বছরের শেষে মার-এ-লাগো রিসোর্টে জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হতে পারে, তবে বর্তমান পরিস্থিতি শুধুই জল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। মূলত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কোনো যৌথ ঘোষণা বা বড় অর্থনৈতিক চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। চীন থেকে খালি হাতে ফেরার পরপরই দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে আমেরিকার এই তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ
কূটনৈতিক মহলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ চীন সাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে চীনের একতরফা আধিপত্য ঠেকাতে আমেরিকা এখন মরিয়া হয়ে কোয়াড (Quad) জোটকে সক্রিয় করতে চাইছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হওয়ায় এই অঞ্চলের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। চীন এই সামুদ্রিক পথগুলো অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করায় ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে গঠিত কোয়াড জোটের সক্রিয়তা এখন সময়ের দাবি। তবে ভারত নিজের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রেখে রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো বিকল্প উৎস থেকে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পথেই হাঁটছে।
ভিসা নীতিতে বড় ধাক্কা এবং ভারতের পাল্টা চাল
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় অস্বস্তি তৈরি করেছে আমেরিকার নতুন ভিসা ও অভিবাসন নীতি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন যে গ্রিন কার্ডের নতুন নিয়ম ভারতকে লক্ষ্য করে করা হয়নি, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। মার্কিন কঠোরতার কারণে ভারত থেকে এইচ-১বি (H1B) ভিসা এবং গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে, যা ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের জন্য বড় ধাক্কা। এই মেধা পাচার রুখতে এবং মার্কিন আগ্রাসী নীতি মোকাবিলায় ভারত এখন অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো উন্নয়নে জোর দিচ্ছে, যার অংশ হিসেবে বিশাখাপত্তনমে বিশ্বমানের ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা হচ্ছে।
এক ঝলকে
- কোনো দাপ্তরিক চিঠি ছাড়াই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে হোয়াইট হাউসের অনানুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ঘিরে কূটনৈতিক প্রোটোকল বিতর্ক শুরু হয়েছে।
- চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর এশীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে আমেরিকা হঠাৎ কোয়াড জোট নিয়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে।
- দক্ষিণ চীন সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে চীনের একতরফা দাপট রুখতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা কোয়াড দেশগুলোর প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
- আমেরিকার নতুন অভিবাসন নীতির কারণে ভারতীয়দের এইচ-১বি ভিসা ও গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রায় ৩৮-৪০% হ্রাস পাওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।