সুস্থতার চাবিকাঠিমানে সঠিক তেল বাছাই করা! বাঙালি রান্নায় কোন তেল নিরাপদ, জানালেন চিকিৎসক

বিশ্বজুড়ে অস্থির পরিস্থিতির কারণে ভোজ্য তেলের জোগান ও রপ্তানিতে ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে রান্নায় তেলের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তবে কেবল অর্থনৈতিক বা বৈশ্বিক সংকটের কারণেই নয়, চিকিৎসকদের মতে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে হলেও দৈনন্দিন জীবনে তেলের ব্যবহারে লাগাম টানা জরুরি। তবে শুধু তেলের পরিমাণ কমালেই চলবে না, সেই সঙ্গে কোন তেল খাওয়া হচ্ছে, তা নির্বাচন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে রান্নায় তেলের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মাছ ভাজা, ঝোল, চচ্চড়ি কিংবা কষা মাংস— তেল ছাড়া যেন রসনাতৃপ্তি আসাম্ভব। তবে তেল নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তিও কম নয়। এ বিষয়ে প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, সুস্থ শরীরের জন্য তেল পুরোপুরি বর্জন করা ভুল সিদ্ধান্ত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ মিলিলিটার (মাসে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিলিটার) তেল প্রয়োজন। এর চেয়ে বেশি তেল নিয়মিত গ্রহণ করলে হৃদরোগ, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা এবং রক্তনালিতে চর্বি জমার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
তেল বাছাইয়ের বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি
কোন তেল শরীরের জন্য ভালো, তা মূলত তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমত, তেলের ‘স্মোক পয়েন্ট’ বা যে তাপমাত্রায় তেল পুড়তে শুরু করে। অতিরিক্ত তাপে তেল পুড়লে শরীরে ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, তেলের ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ। ট্রান্স ফ্যাট রক্তনালিতে চর্বি জমিয়ে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তৃতীয়ত, তেলে থাকা মনোআনস্যাচুরেটেড ও পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের ভারসাম্য, যা হরমোন ও কোষের গঠনে ভূমিকা রাখে।
বাঙালি রান্নায় সেরার লড়াই ও বর্জনের তালিকা
বাঙালির ঐতিহ্যবাহী রান্নার ধরন ও স্বাদের দিক থেকে বিচার করলে সবচেয়ে উপযোগী হলো সরষের তেল, বিশেষ করে ‘কোল্ড প্রসেসড’ বা ঘানি ভাঙা সরষের তেল। এতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট অক্ষত থাকে। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলকে সেরা বলা হলেও তা উচ্চ তাপমাত্রার বাঙালি ভাজাভুজি বা কষা রান্নার জন্য উপযুক্ত নয়।
দৈনন্দিন রান্নায় সরষের তেলের পাশাপাশি সূর্যমুখী (সানফ্লাওয়ার), চিনাবাদাম ও তিলের তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে যেসব তেল সাধারণ তাপমাত্রায় জমে যায়, যেমন— বনস্পতি ও পাম অয়েল, সেগুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এই তেলগুলোতে স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকায় তা হৃদযন্ত্রের বড় ক্ষতি করে। অন্যদিকে, নারকেল তেল দ্রুত শক্তি জোগালেও এতে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকায় তা পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। মূলত, শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়া সচল রাখতে তেল একেবারে বন্ধ না করে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক তেল নির্বাচনই সুস্থ থাকার আসল উপায়।