কোন্দল ও বিতর্কের অবসান, অবশেষে ভেঙে দেওয়া হলো কাঁথি পৌরসভা!

অধিকারী গড়ের খাসতালুক বলে পরিচিত পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি পৌরসভায় শেষমেশ বড়সড় প্রশাসনিক রদবদল ঘটে গেল। শাসকদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর লাগাতার প্রশাসনিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত বর্তমান বোর্ডটি পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছে রাজ্য সরকার। আর এর সঙ্গেই মুছে গেল বিদায়ী চেয়ারম্যান সুপ্রকাশ গিরির নাম। কাঁথি পৌরসভার নতুন প্রশাসক হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন মহকুমা শাসক প্রতীক অশোক ধুমাল। সোমবার সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ তিনি পৌর প্রশাসনিক ভবনে এসে কাজ শুরু করেন।
বিতর্কের সূত্রপাত ও বোর্ড ভাঙার নেপথ্য কারণ
২০২২ সালের পৌরভোটে ২১টি আসনের মধ্যে ১৭টিতে জিতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বোর্ড গঠন করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। প্রথমদিকে চেয়ারম্যান পদের দায়িত্ব সামলান বর্ষীয়ান কাউন্সিলর সুবল মান্না। তবে একটি বেসরকারি স্কুলের অনুষ্ঠানে বর্ষীয়ান সাংসদ শিশির অধিকারীকে প্রণাম করা নিয়ে দলের ভেতরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। পরিস্থিতি জটিল রূপ নিলে সুবল মান্নার বিরুদ্ধে তৃণমূল অনাস্থা প্রস্তাব আনে এবং অনাস্থা ভোটে হেরে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়।
পরবর্তীতে তৎকালীন মন্ত্রী অখিল গিরির পুত্র সুপ্রকাশ গিরি নতুন চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পান। তবে শুরু থেকেই এই নতুন বোর্ডের কাজকর্ম ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা মহলে বিতর্ক দানা বাঁধে। অনিয়মের অভিযোগে তৎকালীন পৌর নগরোন্নয়ন দফতর সুপ্রকাশ গিরির বোর্ডকে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজ করেছিল। পরবর্তীতে রাজ্যের নতুন সরকারের পৌর দফতরও পুনরায় কড়া শোকজ নোটিশ পাঠায়। চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতি এবং কাউন্সিলরদের একের পর এক পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার জেরে পৌরসভার স্বাভাবিক নাগরিক পরিষেবা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এই চরম প্রশাসনিক অচলাবস্থার কারণেই গত শুক্রবার রাজ্য সরকার এই বোর্ডটি ভেঙে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রশাসনিক পরিবর্তন ও সম্ভাব্য প্রভাব
নতুন প্রশাসক পৌরসভায় আসার আগেই কার্যালয় থেকে প্রাক্তন চেয়ারম্যান সুপ্রকাশ গিরির নামাঙ্কিত বোর্ড সরিয়ে দেওয়া হয়। সোমবার মহকুমা শাসক দায়িত্ব নিতে এলে তাঁকে স্বাগত জানান দক্ষিণ কাঁথির বিজেপি বিধায়ক অরূপ কুমার দাস এবং বিরোধী শিবিরের প্রাক্তন কাউন্সিলররা। পৌরসভার কর্মীরাও নতুন প্রশাসককে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
পৌরসভাটি কোনো নির্বাচিত বোর্ডের হাত থেকে সরাসরি সরকারি প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় এখন এলাকার স্তব্ধ হয়ে থাকা নাগরিক পরিষেবাগুলো দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একটি বড় ব্যবধানের বোর্ড এভাবে ভেঙে যাওয়া এবং মহকুমা শাসকের হাতে দায়িত্ব চলে যাওয়া ওই অঞ্চলের স্থানীয় রাজনীতিতে শাসকদলের অভ্যন্তরীণ ফাটলকে আরও স্পষ্ট করে তুলল। অন্যদিকে, এই ঘটনার পর বিরোধী শিবির বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিকভাবে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চালাবে, যা আগামী দিনে এই এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে।