অভিষেকের ‘গড়ে’ তীব্র ধস: ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’কে খোঁচা দিয়ে ইস্তফা ৮ তৃণমূল কাউন্সিলরের, ভাঙনের মুখে পুরবোর্ড

ফলতা বিধানসভা উপনির্বাচনের ‘লজ্জাজনক’ ফলাফলের ধাক্কা এখনও দগদগে। তার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারে ঘটল এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক বিপর্যয়। দুর্নীতির পাশাপাশি খোদ অভিষেকের বহুপ্রচারিত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’কে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে একযোগে পদত্যাগ করলেন পুরসভার ৮ জন তৃণমূল কাউন্সিলর। মোট ১৬ আসন বিশিষ্ট এই পুরসভায় অর্ধেকের এই গণপদত্যাগের ফলে ডায়মন্ড হারবার পুরবোর্ডটি কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে।
মহকুমা শাসকের পর চেয়ারম্যানের কাছে ইস্তফা
সোমবার দুপুরে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে ডায়মন্ড হারবার মহকুমা শাসকের (SDO) দফতরে ইস্তফাপত্র দিতে যান তৃণমূলের ৮ জন বিদ্রোহী কাউন্সিলর। তবে পুর আইন অনুযায়ী মহকুমা শাসক সরাসরি পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করায়, পরবর্তীতে তাঁরা পুরসভার চেয়ারম্যান প্রণব দাসের কাছে গিয়ে নিজেদের চিঠি ধরিয়ে দেন। পদত্যাগকারী কাউন্সিলরদের তালিকায় রয়েছেন— ১ নম্বর ওয়ার্ডের দিব্যেন্দু হালদার, ২ নম্বর ওয়ার্ডের মঞ্জু মণ্ডল, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তমাল হালদার, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মৃদুল হালদার, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের স্বপন হালদার, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের অলোক হালদার, xiii নম্বর ওয়ার্ডের অমিত সাহা এবং ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের দেবকি হালদার। এছাড়া আরও দুই কাউন্সিলরের পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন চলছে।
‘চেয়ারম্যান নন, পুরসভা চালাত পুলিশ’— বিস্ফোরক অভিযোগ বিদ্রোহীদের
পদত্যাগী কাউন্সিলরদের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাঁরা সরাসরি আঙুল তুলেছেন ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’-এর দিকে। তাঁদের দাবি, বিগত কয়েক বছর ধরে এই মডেলের নামে এলাকায় চরম অরাজকতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ চলেছে। পুরসভা জুড়ে একের পর এক অবৈধ নির্মাণ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে এবং এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ সরব হলেই পুলিশ দিয়ে তাঁদের মুখ বন্ধ করা হয়েছে, চালানো হয়েছে নির্যাতন। পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান রাজশ্রী দাসের বিরুদ্ধেও একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন তাঁরা। এক বিক্ষুব্ধ কাউন্সিলরের বিস্ফোরক দাবি, ‘‘আসলে চেয়ারম্যান নন, এখানে পুরসভা চালাত পুলিশ।’’
‘আপাতত তৃণমূলে আছি’— ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য চেয়ারম্যানের
এই চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ডায়মন্ড হারবার পুরসভার চেয়ারম্যান প্রণব দাস দাবি করেন, তিনি কাউন্সিলরদের এই ক্ষোভের বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানতেন না। এলাকার উন্নয়নের জন্য তিনি সর্বদা চেষ্টা করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বোর্ড ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু এলাকার উন্নয়নের জন্যই সকলের প্রয়োজন ছিল।” তবে সবথেকে বড় জল্পনা তৈরি হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে। দল বদলের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাওয়া হলে চেয়ারম্যান ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন, ‘‘আপাতত তৃণমূলে আছি।’’
ফলতার নির্বাচনের পর ডায়মন্ড হারবার পুরসভার এই নজিরবিহীন বিদ্রোহ প্রমাণ করছে যে, জেলা তৃণমূলের অন্দরে ফাটল কতটা চওড়া হয়েছে। এই ভাঙন সামাল দিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘গড়’ কীভাবে রক্ষা করেন, সেটাই এখন দেখার।
এক ঝলকে
- ফলতার উপনির্বাচনে হারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ডায়মন্ড হারবার পুরসভায় তৃণমূলের অন্দরে বিশাল ধস।
- ১৬ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ১, ২, ৭, ৮, ৯, ১১, ১৩ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের ৮ জন কাউন্সিলর একযোগে পদত্যাগ করলেন।
- “মডেলের নামে অরাজকতা ও দুর্নীতি চলেছে, চেয়ারম্যান নন পুরসভা চালাত পুলিশ”— বিস্ফোরক অভিযোগ বিদ্রোহীদের।
- পুরবোর্ড ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কার মাঝেই পুর চেয়ারম্যান প্রণব দাসের ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, “আপাতত তৃণমূলে আছি।”