চন্দ্রবাবুর অন্ধ্র-মডেল বনাম শুভেন্দুর বাংলা, গত ২ বছরে ২০ লক্ষ কোটি লগ্নির খতিয়ান ও পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাবনা

চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর থেকেই দিল্লির দরবারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ভরসার মুখ হয়ে উঠেছেন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন. চন্দ্রবাবু নায়ডু (N. Chandrababu Naidu)। এনডিএ সরকারের অন্যতম প্রধান শরিক হিসেবে তেলুগু দেশম পার্টি (TDP)-র এই রাজনৈতিক গুরুত্বকে তিনি রূপান্তর করেছেন অন্ধ্রের অর্থনৈতিক শক্তিতে। চব্বিশ মাসেরও কম সময়ে অন্ধ্রপ্রদেশ ২০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, যার মধ্যে ১১.৮ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগকে ইতিমধ্যে অনুমোদন দিয়েছে অন্ধ্রের স্টেট ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন বোর্ড (SIPB)।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— চন্দ্রবাবু নায়ডু যদি দিল্লির ওপর নিজের রাজনৈতিক প্রভাবকে ‘লেভারেজ’ হিসেবে ব্যবহার করে অন্ধ্রের ভোল বদলে দিতে পারেন, তবে পশ্চিমবঙ্গ কেন পারবে না? ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে এবং তৃণমূলের সম্ভাব্য ভাঙনের আবহে বাংলায় বিজেপির রাজনৈতিক গুরুত্ব এখন অপরিসীম। এমতাবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও শমীক ভট্টাচার্যরা দিল্লিতে দরবার করে অন্ধ্রপ্রদেশের মতো পশ্চিমবঙ্গের জন্যও বিশেষ অর্থনৈতিক সহায়তা, ডেটা সেন্টার, শিল্প করিডর ও বৃহৎ পরিকাঠামো প্রকল্পের দাবি আদায়ে সফল হবেন কি না, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে।
গত দু’বছরে চন্দ্রবাবু নায়ডুর হাত ধরে অন্ধ্রপ্রদেশ যে সমস্ত মেগা বিনিয়োগ পেয়েছে, তার এক নজরে খতিয়ান নিচে দেওয়া হলো:
১. গুগলের ঐতিহাসিক ডিল (Google’s AI Hub)
আমেরিকার সিলিকন ভ্যালির বাইরে গুগলের বৃহত্তম ও সবচেয়ে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হাব (AI Hub) নির্মাণের জন্য দিল্লির দরবারে চন্দ্রবাবু নায়ডুর সাথে চুক্তি সই করেছেন সুন্দর পিচাই।
- বিনিয়োগের পরিমাণ: আগামী ৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা)।
- প্রকল্পের পরিধি: বিশাখাপত্তনমে ১-গিগাবাইট স্কেলের একটি মেগা এআই হাব গড়ে তোলা হবে।
- সহযোগী প্রকল্প: গুগলের এই ডেটা সেন্টারের সমান্তরালেই গৌতম আদানির ‘আদানি গোষ্ঠী’ যৌথ উদ্যোগ ‘আদানি-কানেক্স’ (AdaniConneX)-এর মাধ্যমে সেখানে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪১,৭০০ কোটি টাকা) বিনিয়োগে একটি বিশাল ডেটা সেন্টার কমপ্লেক্স তৈরি করছে।
২. রিলায়েন্সের মেগা বিনিয়োগ (Reliance’s Green Energy)
মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অন্ধ্রে শিল্পায়নের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তেল ও গ্যাস উত্তোলনে ইতিমধ্যেই ২ লক্ষ ২১ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ ছাড়াও তারা নতুন দুটি মেগা প্রজেক্টের চুক্তি করেছে:
- ডেটা সেন্টার প্রজেক্ট: ১০৮,০১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাখাপত্তনমে একটি অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার।
- গ্রিন এনার্জি: শ্রী সত্য সাই জেলায় ৫১,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশাল সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম।
৩. আর্সেলো মিত্তল (ArcelorMittal)
লক্ষ্মী মিত্তলের ‘আর্সেলো মিত্তল’ অন্ধ্রপ্রদেশের পরিকাঠামো ও উৎপাদন শিল্পে ১ লক্ষ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের সবুজ সংকেত (Green Signal) দিয়েছে।
জাতীয় স্তরে অন্ধ্রের উল্লম্ফন ও ওড়িশা-মহারাষ্ট্রকে পিছনে ফেলা
শিল্প মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০ animation-২৬ আর্থিক বছরে সমগ্র ভারতে প্রস্তাবিত মোট শিল্প বিনিয়োগের (Proposed Investments) এক-চতুর্থাংশই একা টেনে নিয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ।
- অন্ধ্রপ্রদেশ: ২৫ শতাংশ (প্রথম)
- ওড়িশা: ১৩.১ শতাংশ (দ্বিতীয়)
- মহারাষ্ট্র: ১২.৮ শতাংশ (তৃতীয়)
২০২৫ সালের নভেম্বরে বিশাখাপত্তনমে আয়োজিত ‘সিআইআই পার্টনারশিপ সামিটে’ (CII Partnership Summit 2025) অন্ধ্র সরকার মোট ৬১০টি মউ (MoUs) সই করেছে, যার আর্থিক মূল্য ১৩.২৫ লক্ষ কোটি টাকা এবং যা থেকে ১৬.১৩ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে চলেছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র পরিবেশবান্ধব ‘ক্লিন এনার্জি’ প্রকল্পেই রয়েছে ৫.৩৩ লক্ষ কোটি টাকা।
ফাইল থেকে মাঠে: ‘গ্রাউন্ডিং’ স্ট্র্যাটেজি
চন্দ্রবাবু নায়ডু মোট ১১.৪৭ লক্ষ কোটি টাকার ২৮২টি অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে ইতিমধ্যেই ১১৪টি প্রকল্পকে ‘গ্রাউন্ডিং’ অর্থাৎ মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর স্তরে নিয়ে গেছেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সমস্ত অনুমোদিত প্রকল্পের কাজ শুরু করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তিনি, যার গতি সরাসরি তদারকি করছে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের অধীনে থাকা একটি ‘সিঙ্গেল-পোর্টাল ড্যাশবোর্ড’।
পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাবনা: বঞ্চনা ও সংঘাতের রাজনীতি পেরিয়ে নতুন আশা
বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি মূলত কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের আবর্তে কেটেছে। বামফ্রন্টের ৩৪ বছর কেটেছে ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’র স্লোগান তুলে, আর তৃণমূল কংগ্রেসের সাড়ে ১৩ বছরের অধ্যায় কেটেছে লাগাতার সংঘাত ও প্রকল্পের নাম বদলে ক্রেডিট নেওয়ার চক্করে। এর ফলে রাজ্য হাজার হাজার কোটি টাকার কেন্দ্রীয় অনুদান ও শিল্প সম্ভাবনা হারিয়েছে।
কিন্তু অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় উপভোক্তা বাজার এখনও রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। সেই সঙ্গে রয়েছে সমুদ্রবন্দর, গভীর সমুদ্র বন্দরের সম্ভাবনা, বিস্তীর্ণ রেল যোগাযোগ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং ঐতিহাসিক শিল্পভিত্তি। অন্ধ্রের মতো সুসংহত রাজনৈতিক-প্রশাসনিক মডেল এবং দিল্লির সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করা গেলে ডেটা সেন্টার, গ্রিন এনার্জি, ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং, লজিস্টিক্স এবং ফিনটেক (Fintech) খাতে পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাবনা বিশাল। চন্দ্রবাবুর এই ‘ডেভেলপমেন্ট পলিটিক্স’ ও দূরদর্শিতাকে মডেল করে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগালে শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষেও পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক ভোল বদলে দেওয়া আসাম্ভব কিছু নয়।
এক ঝলকে
- দিল্লির ওপর রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে গত ২ বছরে ২০ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে চন্দ্রবাবু নায়ডুর অন্ধ্রপ্রদেশ।
- দেশের মোট প্রস্তাবিত শিল্প বিনিয়োগের ২৫% একা পেয়ে ওড়িশা ও মহারাষ্ট্রকে পিছনে ফেলে শীর্ষে অন্ধ্র।
- বিশাখাপত্তনমে গুগলের ১ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকার মেগা এআই হাব এবং রিলায়েন্সের মেগা গ্রিন এনার্জি ও ডেটা সেন্টার প্রকল্প তৈরি হচ্ছে।
- সংঘাতের রাজনীতি ছেড়ে অন্ধ্রের এই সুসংহত মডেল অনুসরণ করলে বিপুল উপভোক্তা বাজার ও বন্দর পরিকাঠামোযুক্ত পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন সম্ভব।