বাংলায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) লাগু হলে কী কী বদল আসতে পারে? আসামের খসড়া বিল ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ (UCC) লাগু হওয়া নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির সঙ্কল্প পত্রেও এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এর মাঝেই প্রতিবেশী রাজ্য আসামে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার নতুন সরকার শপথ নেওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে বিধানসভায় ১৫৪ পাতার এক ঐতিহাসিক UCC বিল পেশ করেছে। উত্তরাখণ্ড ও গুজরাতের পর আসামে এই বিল পেশ হওয়ার পর, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের ধারণা—বাংলাতেও UCC লাগু হলে আসামের খসড়া বিলের ধাঁচেই একাধিক আমূল পরিবর্তন আসতে চলেছে।
বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, লিভ-ইন রিলেশন এবং সম্পত্তি উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কী কী বড় বদল ঘটতে পারে, দেখে নেওয়া যাক:
১. লিভ-ইন রিলেশনে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন ও শাস্তি
UCC-র সবচেয়ে চর্চিত এবং বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে। এতদিন যুবক-যুবতীরা আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই নিজেদের ইচ্ছায় লিভ-ইন রিলেশনে থাকতে পারতেন। কিন্তু নতুন বিধি অনুযায়ী:
- যেকোনো যুগল লিভ-ইন সম্পর্কে থাকলে তাঁদের নির্দিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে সম্পর্কের বাধ্যতামূলক নথিভুক্তকরণ বা রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
- সংশ্লিষ্ট রাজ্যের কোনো বাসিন্দা যদি রাজ্যের বাইরে গিয়েও লিভ-ইন সম্পর্কে জড়ান, তাহলেও তাঁদের নিজ এলাকার সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে তা নথিভুক্ত করতে হবে।
- এই নিয়ম অমান্য করলে বা রেজিস্ট্রেশন না করে লিভ-ইন রিলেশনে থাকলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
২. বহুবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ ও বিয়ের নির্দিষ্ট শর্ত
বিয়ে এবং ডিভোর্সের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সবার জন্য এক আইন কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে:
- বহুবিবাহ নিষিদ্ধ: বিয়ের সময় স্বামী বা স্ত্রীর অন্য কোনো বৈধ জীবনসঙ্গী জীবিত থাকা চলবে না। অর্থাৎ, আইনত এক স্বামী বা এক স্ত্রী বর্তমান থাকাকালীন দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না।
- বিয়ের বয়স: বিয়ের জন্য পাত্রের বয়স ন্যূনতম ২১ বছর এবং পাত্রীর বয়স ন্যূনতম ১৮ বছর হতেই হবে।
- বিয়ের আবশ্যিক রেজিস্ট্রেশন: বিয়ের ৬০ দিনের মধ্যে তার রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। বিবাহবিচ্ছেদ বা ডিভোর্সের ক্ষেত্রেও আদালতের ডিক্রি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে আইনিভাবে তার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হবে।
- পূর্ববর্তী কোনো বিয়ে যদি আইনি উপায়ে বা আদালতের মাধ্যমে সরকারিভাবে বাতিল না হয়, তবে পুনরায় কোনো নতুন বিয়ে আইনি বৈধতা পাবে না।
৩. সম্পত্তিতে সমানাধিকার ও লিঙ্গসমতা
উত্তরাধিকার আইন বা সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রেও বড়সড় সংস্কার আনা হচ্ছে, যেখানে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে:
- কোনো ব্যক্তি যদি কোনো ‘উইল’ বা শংসাপত্র না রেখে মারা যান, তবে তাঁর সম্পত্তি বণ্টন হবে সম্পূর্ণ অভিন্ন এবং লিঙ্গসমতার ভিত্তিতে।
- প্রথম সারির বা ‘Class-1’ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান এবং বাবা-মাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সম্পত্তির আইনি অধিকার নিশ্চিত করা হবে। এর ফলে সম্পত্তিতে কন্যাসন্তান বা স্ত্রীদের অধিকার আরও সুদৃঢ় হবে।
৪. তফসিলি জনজাতিদের ক্ষেত্রে ছাড়
আসামের খসড়া বিল অনুযায়ী, ২০১১ সালের জনগণনা ভিত্তিক সে রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ১২.৪৪ শতাংশ থাকা তফসিলি জনজাতি (ST) সম্প্রদায়কে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, পশ্চিমবঙ্গেও যদি এই বিল আনা হয়, তবে আদিবাসী ও তফসিলি জনজাতিদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার্থে তাঁদের এই বিধির আওতা থেকে ছাড় দেওয়া হতে পারে।
আসামে এই বিল পেশের পর থেকেই বিরোধী দল কংগ্রেস এর তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছে এবং আরও আলোচনার দাবি জানিয়েছে। তবে বাংলাতেও যে খুব শীঘ্রই এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা এক দেশ এক আইনের পথে হাঁটার প্রস্তুতি শুরু হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কোনো সন্দেহ নেই।
এক ঝলকে
- আসামে নতুন সরকার গঠনের দুই সপ্তাহের মধ্যে ১৫৪ পাতার ঐতিহাসিক UCC বিল বিধানসভায় পেশ করা হলো।
- নতুন নিয়ম অনুযায়ী লিভ-ইন সম্পর্কে থাকতে গেলে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন করতে হবে, না হলে মিলবে শাস্তি।
- বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে বিয়ের ৬০ দিনের মধ্যে এবং ডিভোর্সের ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
- কোনো উইল ছাড়া কেউ মারা গেলে স্বামী/স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মা সমানভাবে সম্পত্তির অংশীদার হবেন; নিশ্চিত হবে লিঙ্গসমতা।
- আসামের খসড়া বিলে তফসিলি জনজাতিদের (ST) এই আইনের পরিধি থেকে বাইরে রাখা হয়েছে।