পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে দেহব্যবসায় বাধ্য হচ্ছেন মেয়েরা, ভারতের এক প্রাচীন উপজাতির অন্ধকার দিক

ভারতের বুকে আজও এমন এক আদিম প্রথা টিকে রয়েছে, যেখানে পরিবারের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে ঘরের মেয়েদের ঠেলে দেওয়া হয় যৌনপেশায়। মধ্য ও উত্তর ভারতের যাযাবর ‘বেদিয়া’ বা বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে এই রীতি যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। চরম বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই অন্ধকার জগতে মেয়েদের নামানোর পেছনে কোনো বহিরাগত চক্র নয়, বরং খোদ বাবা ও ভাইয়েরাই গ্রাহক খুঁজে আনার গুরুদায়িত্ব পালন করেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চেনা রীতিনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই সম্প্রদায়ের সম্পূর্ণ অর্থনীতি দাঁড়িয়ে রয়েছে নারীদের উপার্জনের ওপর।
ইতিহাসের দায় এবং জীবিকার সংকট
ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে বেদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বার্তাবাহক ও গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছিলেন। এর প্রতিশোধ নিতে ব্রিটিশ শাসকেরা পুরো সম্প্রদায়কে ‘অপরাধী উপজাতি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। যদিও স্বাধীনতার পর এই কলঙ্কজনক তকমা তুলে নেওয়া হয়, ততদিনে মূলধারার সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বেদিয়ারা। রাজতন্ত্রের অবসান এবং বনাঞ্চলের আইন পরিবর্তনের পর জীবিকা হারিয়ে চরম সংকটে পড়েন এই অরণ্যবাসীরা। বেঁচে থাকার তাগিদে এবং চরম দারিদ্র্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একসময় এই সম্প্রদায়ের নারীরা দেহব্যবসাকেই প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হন।
শ্রমের অদ্ভুত বিভাজন ও পরজীবী পুরুষতন্ত্র
বেদিয়া সমাজে নারী শ্রমের এক জটিল ও নিখুঁত অর্থনৈতিক বিন্যাস লক্ষ্য করা যায়। এই সম্প্রদায়ের পুরুষেরা মূলত পরজীবী, যাঁরা উপার্জনের জন্য সম্পূর্ণভাবে ঘরের মেয়েদের ওপর নির্ভরশীল। ঘরের অবিবাহিত মেয়েরা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো মাত্রই একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই পেশায় দীক্ষিত হন। তাঁরা ত্রিশের কোঠা পেরিয়েও অবিবাহিত থেকে দেহব্যবসার মাধ্যমে দিনে ১,২০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন, যা সরকারি ন্যূনতম মজুরির চেয়ে বহুগুণ বেশি। এই উপার্জনে বাধা যাতে না আসে, সেজন্য ঘরের মেয়েদের প্রেম বা বিয়ে করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অন্য দিকে, পুরুষেরা বংশবৃদ্ধি ও গৃহস্থালির কাজের জন্য বাইরে থেকে নারী বিয়ে করে নিয়ে আসেন। পরিবারের বিবাহিত বধূরা ঘরের কাজ ও সন্তানদের দেখাশোনা করেন, যার ফলে যৌনপেশায় থাকা মায়েরা নিশ্চিন্তে বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারেন।
সামাজিক প্রভাব ও উত্তরণের চেষ্টা
যুগ যুগ ধরে চলা এই প্রথা কোনো স্বেচ্ছাকৃত বিষয় নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবের এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্যের কারণে বেদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা মূলধারার কর্মসংস্থান থেকে আজও দূরে রয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অন্ধকার বৃত্ত থেকে বের হওয়ার কিছু আলো দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ এবং অসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) সহায়তায় বেদিয়া সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার চেষ্টা চলছে। তরুণী ও শিশুদের এই চক্র থেকে উদ্ধার করে মূলধারার সমাজে পুনর্বাসন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা এই প্রাচীন কুপ্রথা বিলুপ্তির পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।