মানুষের কপালে কি সত্যিই ছিল তৃতীয় চোখ, যুগান্তকারী তথ্য দিলেন বিজ্ঞানীরা
মানুষের কি সত্যিই ‘তৃতীয় চোখ’ ছিল? বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই রহস্যের জট খুলেছে, যা মানব বিবর্তনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। গবেষকদের দাবি, মানুষের মস্তিষ্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা পিনিয়াল গ্রন্থিই আসলে প্রাচীন ‘তৃতীয় চোখ’-এর অবশেষ। এটি এখন আর সরাসরি দেখতে না পারলেও মানুষের ঘুম, হরমোন এবং সামগ্রিক দেহঘড়ি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা কারেন্ট বায়োলজি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় ও লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, লক্ষ লক্ষ বছর আগে মানব পূর্বপুরুষদের মাথার মাঝখানে একটি বিশেষ আলোক-সংবেদনশীল চোখ ছিল। সময়ের সাথে সাথে বিবর্তনের ধারায় সেটিই রূপান্তরিত হয়েছে বর্তমানের পিনিয়াল গ্রন্থিতে।
বিবর্তনের ইতিহাস ও কারণ
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীরা যখন অন্ধকার ও কর্দমাক্ত সমুদ্রে বাস করত, তখন তাদের দুই পাশের চোখ কার্যকারিতা হারাতে শুরু করে। সেই প্রতিকূল পরিবেশে দিন-রাতের পার্থক্য বুঝতে এবং দিক নির্ণয় করতে মাথার মাঝখানে থাকা একটি বিশেষ আলোক-সংবেদনশীল অংশ সাহায্য করত। গবেষকরা একেই “প্রাচীন মধ্যবর্তী চোখ” বলে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীকালে প্রাণীরা যখন গভীর অন্ধকার বা সুড়ঙ্গে বসবাস শুরু করে, তখন মাঝের সেই আলোক-সংবেদনশীল অংশের একাংশ দুই পাশে সরে গিয়ে বর্তমান রেটিনায় পরিণত হয় এবং অবশিষ্টাংশ মস্তিষ্কের ভেতরে পিনিয়াল গ্রন্থির রূপ নেয়। নিউজিল্যান্ডের বিরল সরীসৃপ টুয়াটারার মাথায় আজও এই ধরনের আলোক-সংবেদনশীল চোখের অস্তিত্ব দেখা যায়।
মানব শরীরে বর্তমান প্রভাব
বর্তমানে পিনিয়াল গ্রন্থি সরাসরি আলো দেখতে পায় না, তবে চোখের মাধ্যমে পাওয়া আলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ নিয়ন্ত্রণ করে। এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত মেলাটোনিন হরমোন মানুষকে ঘুমানোর সংকেত দেয়। রাত বাড়লে মেলাটোনিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং দিনে তা কমে যায়। শুধু ঘুম নয়, মানুষের মেজাজ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, শরীরের তাপমাত্রা এবং প্রজনন ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখতে এই অঙ্গটি কাজ করে।
দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু ও যোগশাস্ত্রে পিনিয়াল গ্রন্থির অবস্থানকে ‘আজ্ঞা চক্র’ বা ‘তৃতীয় নয়ন’ হিসেবে আধ্যাত্মিক গুরুত্ব দেওয়া হলেও, বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা এর জৈবিক প্রয়োজনীয়তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোয় নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করল। ঘুমের সমস্যা, বিষণ্ণতা এবং হরমোনজনিত জটিলতার চিকিৎসায় এই আবিষ্কার আগামী দিনে অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।