ভোট দিয়েছেন, কেউ জন্মসূত্রেও ভারতীয়, হাকিমপুরে এখন বাংলাদেশ ফেরার করুণ অপেক্ষা!

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ রুখতে নজিরবিহীন প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হতেই উত্তর চব্বিশ পরগনার স্বরূপনগর থানা এলাকার হাকিমপুর সীমান্তে এক অভূতপূর্ব ও চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পর অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়া জোরদার হতেই আইনি জটিলতা এড়াতে গত কয়েকদিনে শয়ে শয়ে বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে এসে আত্মসমর্পণ করছেন। গত ৭২ ঘণ্টায় হাকিমপুর সীমান্ত এলাকায় প্রায় সাড়ে তিনশো বাংলাদেশির উপস্থিতির খবর মিলেছে, যার মধ্যে ২৫০ জনকে স্বরূপনগর ও বাদুড়িয়ার বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে স্থানান্তর করেছে প্রশাসন।
পরিচয়ের দোলাচল ও নথির সংকট
জেলা প্রশাসন ও বিএসএফ সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত পার হতে আসা ব্যক্তিদের পরিচয় ও নথিপত্র কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ দুই বছর, কেউ পাঁচ বছর, আবার কেউ বা এক দশক আগে দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। তদন্তে অনেকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এক নাম এবং ভারতে ভুয়ো পরিচয়ে অন্য নামে থাকার অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ভারতে জন্ম নেওয়া বা দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করা পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে। অনেকেরই আধার, প্যান বা রেশন কার্ডের মতো ভারতীয় নথি থাকা সত্ত্বেও, ২০০২ সালের আগের বসবাসের পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় তাঁদের অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ভয় এবং ভিটেমাটি ছাড়ার কারণ
সীমান্তে অপেক্ষমাণদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পুলিশের কড়া নজরদারি, নথিপত্র তল্লাশি এবং আটক হওয়ার তীব্র ভয় তাঁদের ঘরছাড়ো হতে বাধ্য করেছে। কলকাতার নিউ টাউন, হাতিয়ারা, খড়দহ, দমদম ও ডানকুনি এলাকায় দিনমজুর, কাঠমিস্ত্রি কিংবা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা এই মানুষেরা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। এমনকি মাফুজা খাতুনের মতো কেউ কেউ দাবি করেছেন যে, স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে আধার ও ভোটার কার্ড তৈরি করে তাঁরা একাধিকবার ভারতে ভোটও দিয়েছেন, যা এখন বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে, খড়দহের দৃষ্টিহীন মহম্মদ শামসুর রহমানের মতো চরম অসহায় পরিবারগুলোও এখন অবিলম্বে বাংলাদেশে ফেরার আর্জি জানাচ্ছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রভাব
এই উচ্ছেদের ফলে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে নতুন প্রজন্ম। হিদয় মোল্লার মতো তরুণরা, যাঁরা ভারতে জন্মগ্রহণ করে এ দেশের সংস্কৃতিতেই বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ অচেনা এক ভূখণ্ড। সেখানে তাঁদের কোনো জমি বা আত্মীয়স্বজন নেই। ফলে এই জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তন সীমান্ত এলাকায় বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আপাতত হাকিমপুর সীমান্তে পুলিশ একটি রেজিস্ট্রেশন ডেস্ক তৈরি করে সমস্ত নথি যাচাইয়ের কাজ চালাচ্ছে। প্রশাসন জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিধি মেনেই হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।