এভারেস্টের ‘ডেথ জোন’: ৮০০০ মিটারের উপরে পা রাখলেই কেন ঘনিয়ে আসে মৃত্যু?

মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে জল জমে লোপ পায় বিচারবুদ্ধি, এভারেস্টের ডেথ জোনে পা রাখা মানেই কি নিশ্চিত মৃত্যু!
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের ৮,০০০ মিটারের ওপরের অংশটি পর্বতারোহণের পরিভাষায় পরিচিত ডেথ জোন হিসেবে। এই উচ্চতায় পৌঁছানো মাত্রই মানুষের শরীর তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় এখানে অক্সিজেনের মাত্রা মাত্র এক-তৃতীয়াংশ হওয়ায় মানবদেহে শুরু হয় চরম বিপর্যয়। ২০২৬ সালের চলমান মরশুমেও এভারেস্টের এই প্রতিকূল অঞ্চলে পাঁচজন পর্বতারোহীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দু’জন ভারতীয় আরোহী রয়েছেন। পর্বতারোহীদের মাত্রাতিরিক্ত ভিড়, ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তীব্র শারীরিক ক্লান্তির কারণে এই অঞ্চলটি বর্তমানে এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
হাইপোক্সিয়ার মরণকামড় ও শারীরিক বিপর্যয়
এই উচ্চতায় অক্সিজেন এতই কম থাকে যে কৃত্রিম সিলিন্ডার ছাড়া মানুষ বড়জোর চার মিনিট জ্ঞান ধরে রাখতে পারে। হাইপোক্সিয়ার প্রভাবে মানবদেহের টিস্যুগুলোতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছানো বন্ধ হয়ে যায়, যা সরাসরি মস্তিষ্কে আঘাত হানে। এর ফলে আরোহীরা বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন ও হিতাহিত জ্ঞানশূন্যতায় ভোগেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, এই অবস্থায় ‘হাই অল্টিটিউড সেরিব্রাল এডিমা’ বা মস্তিষ্কে জল জমে যাওয়া এবং ‘হাই অল্টিটিউড পালমোনারি এডিমা’ বা ফুসফুসে জল জমার মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পেশির নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে আরোহীরা সাধারণ সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন।
চূড়া জয়ের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক ফেরার পথ
পর্বতারোহণের ইতিহাসে চূড়ায় ওঠার চেয়েও বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সেখান থেকে নেমে আসার সময়টুকু। জয়ের আনন্দে চূড়ায় পৌঁছনোর পর পর্বতারোহীদের শরীরের শেষ অবশিষ্ট শক্তিটুকুও নিঃশেষ হয়ে যায়। এই অবস্থায় দুর্বল শরীর নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করতে গিয়ে ঘটে মারাত্মক সব ভুল। ডেথ জোনের সরু পথ, যেমন ‘হিলারি স্টেপ’-এ অতিরিক্ত ভিড় আরোহীদের দীর্ঘক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করে, যা তাঁদের মূল্যবান অক্সিজেন দ্রুত ফুরিয়ে দেয়। হিমশীতল বাতাসের মধ্যে এই সাময়িক বিলম্বই অনেক সময় মৃত্যু পরোয়ানা হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃতির এই চরম প্রতিকূলতায় শরীর নিজের ভেতরের চর্বি ও পেশি গ্রাস করতে শুরু করে এবং ফ্রস্টবাইটের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির কবলে পড়ে আরোহীদের অঙ্গহানির ঝুঁকি তৈরি হয়। এভারেস্টের এই মৃত্যু উপত্যকায় মানুষের বেঁচে থাকা আক্ষরিক অর্থেই প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল।