মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি ছাড়েননি মমতা, ইস্তফা দিয়ে জনাদেশকে মান্যতা ভদ্রেশ্বর পুরসভার চেয়ারম্যানের

নিজস্ব প্রতিনিধি, হুগলি: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর যেখানে দলের শীর্ষনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনাদেশকে উপেক্ষা করে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি ছাড়তে চাননি বলে অভিযোগ, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটে এক অনন্য নজির গড়লেন হুগলির ভদ্রেশ্বর পুরসভার (Bhadreswar Municipality) তৃণমূলী চেয়ারম্যান প্রলয় চক্রবর্তী। দলনেত্রীর পদাঙ্ক অনুসরণ না করে, জনতা-জনার্দনের রায়কে মাথা পেতে নিয়ে নিজের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন তিনি। কেবল চেয়ারম্যান একাই নন, তাঁর সঙ্গে নৈতিক দায় মেনে পদত্যাগ করেছেন ঘাসফুল শিবিরের আরও ৭ জন কাউন্সিলর। বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর হুগলি জেলায় এই প্রথম কোনো পুরসভায় এত বড় ধস নামল।
ইন্দ্রনীলের হারের নৈতিক দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ
২২টি ওয়ার্ড বিশিষ্ট ভদ্রেশ্বর পুরসভাটি চন্দননগর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। গত পুরসভা নির্বাচনে এই ২০টি আসনেই জয়লাভ করেছিল তৃণমূল এবং বাকি দুটির একটিতে বিজেপি ও অন্যটিতে নির্দল প্রার্থী জেতেন (পরবর্তীতে তাঁরাও তৃণমূলে যোগ দেন)। ফলে কার্যত বিরোধীশূন্য এই পুরসভায় এবার বিধানসভা ভোটের নিরিখে ১২টিরও বেশি ওয়ার্ডে বিজেপির চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। যার জেরে তৃণমূল প্রার্থী তথা গায়ক-রাজনীতিবিদ ইন্দ্রনীল সেন প্রায় ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত হন।
নিজেদের খাসতালুকে দলের এই শোচনীয় পরাজয়ের পর আর চেয়ারম্যানের পদে আসীন থাকতে চাননি প্রলয় চক্রবর্তী। বৃহস্পতিবার ভদ্রেশ্বর পুরসভার এক্সিকিউটিভ অফিসারের কাছে গিয়ে সশরীরে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। প্রলয় বাবু জানান, “ব্যক্তিগত কারণে ইস্তফা দিয়েছি। মানুষ যখন আমাদের সমর্থন করেছিল, আমরা কাজ করেছি। এখন মানুষ যাদের সমর্থন করছে, তাদেরই কাজ করতে দেওয়া উচিত। দল আমাকে সরতে বলেনি, আমি নিজের ইচ্ছায় জনমতকে মান্যতা দিয়ে সরছি।”
নিয়োগ দুর্নীতির আতঙ্ক? সুর চড়ালো বিজেপি
একযোগে আটজন কাউন্সিলরের এই আকস্মিক ইস্তফাকে কেন্দ্র করে স্বভাবতই শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক তরজা। চন্দননগরের নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ এই প্রসঙ্গে জানান, “এখানে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে কেউ ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেনি, আগামীদিনেও করবে না।” তবে বিজেপির একাংশের দাবি, শুধুমাত্র নৈতিকতার খাতিরে নয়, বরং নতুন সরকারের আমলে পুরসভার বিগত দিনের ‘নিয়োগ কেলেঙ্কারি’র ফাইল খোলার এবং তাতে নাম জড়ানোর আশঙ্কায় তড়িঘড়ি পদ ছেড়ে পালাচ্ছেন এই তৃণমূল নেতারা।
যদিও এই অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছেন পদত্যাগী চেয়ারম্যান প্রলয় চক্রবর্তী। তাঁর সাফ কথা, “আমার পরিবারের কেউ বা দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয়ও পুরসভায় চাকরি করেন না। কাগজে-কলমে দেখলেই বোঝা যাবে, আগের চেয়ারম্যানের সময় নিয়োগ হয়েছিল। আমি ২০১৮ সালে চেয়ারম্যান হয়েছি।”
বোর্ড চালাবেন ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজ খান
তৃণমূলের অন্দরের খবর, একসঙ্গে আটজন কাউন্সিলর পদত্যাগ করলেও ভদ্রেশ্বর পুরসভায় বোর্ড ধরে রাখতে আপাতত কোনো আইনি সমস্যা হবে না তৃণমূলের। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখনো তাদের দিকেই রয়েছে। দলীয় সূত্রের খবর, আপাতত পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজ খানের নেতৃত্বেই আগামী দিনগুলিতে পুরবোর্ড চালানো হবে। তবে ছাব্বিশের পালাবদলের পর নিচুতলার এই গণ-ইস্তফা হুগলি জেলাজুড়ে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিতকে যে আরও নড়বড়ে করে দিল, তা বলাই বাহুল্য।