‘ভর্তি না নিতে আমার সামনে ফোনে হুমকি!’ বিজেপির বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মমতা, বাড়িতেই চিকিৎসা চলবে অভিষেকের

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সোনারপুরে আক্রান্ত হওয়ার পর কলকাতায় ফিরেও চরম হেনস্থার শিকার হতে হলো তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। চোট পাওয়ার পর কলকাতার অ্যাপোলো ও বেলভিউ— দুই বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও ডায়মন্ড হারবারের সাংসদকে ভর্তি নেওয়া হয়নি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবার বর্তমান বিজেপি সরকার ও পুলিশের বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, অভিষেককে যাতে হাসপাতালে ভর্তি না করা হয়, তার জন্য খোদ তাঁর সামনেই চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষকে ফোন করে হুমকি দিচ্ছিল পুলিশ ও বিজেপি নেতারা। শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ফিরে বর্তমানে বাড়িতেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন অভিষেক।
চাকরি চলে যাওয়ার ভয়ে ভর্তি নেয়নি হাসপাতাল, দাবি মমতার
শনিবার রাতে বেলভিউ হাসপাতালের বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং অভিষেকের মা লতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ডেরেক চিকিৎসকদের রিপোর্ট পড়ে জানান যে, অভিষেকের একাধিক শারীরিক পরীক্ষা করা হয়েছে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, “বেলভিউতে অভিষেককে প্রথমে আইটিইউ-তে (ITU) নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যদি ভর্তি করার প্রয়োজনই না থাকে, তাহলে কেন সেখানে রাখা হলো? আসলে আমার সামনেই হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষকে ফোন করে পুলিশের তরফ থেকে হুমকি আসছিল যাতে অভিষেককে ভর্তি করা না হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই আমাকে জানান, বিজেপি নেতা ও পুলিশের থেকে ক্রমাগত হুমকি ফোন আসছে, সেই কারণেই চাকরি চলে যাওয়ার ভয়ে তাঁরা অভিষেককে ভর্তি করতে পারছেন না।”
মমতা জানান, রাত ৮টা নাগাদ অভিষেককে হাসপাতালে আনা হয়েছিল, কিন্তু ভর্তি না নেওয়ায় রাত ১১টা নাগাদ হাতে স্যালাইন বাঁধা অবস্থাতেই তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এবার বাড়িতেই হাসপাতালের মতো পরিকাঠামো তৈরি করে পারিবারিক চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলবে।
‘হেলমেট না থাকলে স্পট ডেড হয়ে যেত!’
সোনারপুরের হামলার ভয়াবহতা উল্লেখ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করেন, “যেভাবে পাথর ছোড়া হয়েছিল, তাতে স্পট ডেড (ঘটনাস্থলেই মৃত্যু) হয়ে যেতে পারত। যদি স্থানীয় ছেলেরা সেই সময় বুদ্ধি করে হেলমেটটা না দিত, তাহলে আজ প্রাণটাই চলে যেত। চিকিৎসকেরা বলেছেন ওর বুকের মাঝখানে রক্ত জমে আছে। অথচ ক্ষমতার আসার এক মাসের মধ্যেই এমন অত্যাচার শুরু করেছে বিজেপি। এখানে মারবে, আবার চিকিৎসা করতেও দেবে না!” বিজেপিকে নিশানা করে তিনি আরও বলেন, “আমাদেরও সরকার ছিল। আমরা আপনাদের গায়ে আঁচড় লাগতে দিইনি। এভাবে অত্যাচার করে সরকার চালানো যায় না, এর জবাব জনগণ দেবে।”
পাশে ইন্ডিয়া জোট, ২ জুন থেকে আন্দোলনে নামছেন মমতা
বিপর্যয়ের পর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত তৃণমূল শিবিরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জাতীয় স্তরের ইন্ডিয়া (INDIA) জোট। অখিলেশ যাদব, মল্লিকার্জুন খাড়গে, অরবিন্দ কেজরিওয়ালরা ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীও ফোন করে অভিষেকের খোঁজ নিয়েছেন এবং প্রয়োজনে হায়দরাবাদে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানোর জন্য সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন।
পাশাপাশি, এবার ঘরের চার দেওয়াল ছেড়ে নিজেই আন্দোলনের ময়দানে নামার ঘোষণা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট জানান, আগামী ২ জুন থেকে কলকাতার রানি রাসমণি রোড থেকে তিনি নিজে নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু করতে চলেছেন। সরকারি অনুমতি প্রসঙ্গে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, “অন্য রাজনৈতিক দলকে অনুমতি দিতে পারলে আমার কর্মসূচিতে কেন বাধা দেবে? নিয়ম অনুযায়ী সব কাজ হবে।”
কী ঘটেছিল সোনারপুরে?
রাজ্যে ছাব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শনিবারই প্রথম কোনো কর্মসূচিতে সশরীরে রাস্তায় নেমেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোনারপুরে ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম, জুতো ও ঢিল ছোড়া হয়। চরম ধস্তাধস্তিতে তাঁর জামা ছিঁড়ে দেওয়া হয় এবং মাথায়-ঘাড়ে চড়-ঘুষি মারা হয় বলে অভিযোগ। সেই অবস্থাতেই তিনি নিহত কর্মীর বাড়ি যান এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। পরে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপে উদ্ধার হয়ে কলকাতায় ফেরেন তিনি। কিন্তু মহানগরে এসেও হাসপাতালের দরজা বন্ধ থাকায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়াল তৃণমূল কংগ্রেস।