ভিন রাজ্যেও গ্রেফতারির খাঁড়া! রক্ষাকবচ তুলে নিয়ে অভিষেকের চাপ বাড়াল মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট

ভিন রাজ্যেও গ্রেফতারির খাঁড়া! রক্ষাকবচ তুলে নিয়ে অভিষেকের চাপ বাড়াল মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট

তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনি জটিলতা দেশের অন্য রাজ্যেও একধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে গেল। এবার মধ্যপ্রদেশে দায়ের হওয়া একটি পুরোনো মানহানি মামলায় নতুন করে বড়সড় আইনি চাপের মুখে পড়লেন তিনি। ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদের ওপর থাকা আইনি রক্ষাকবচ বুধবার প্রত্যাহার করে নিয়েছে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। এর ফলে ভিন রাজ্যে তাঁর বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা বা ওয়ারেন্ট ফের সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কোন মামলায় বাড়ল অস্বস্তি?

বিজেপির প্রবীণ নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয়র ছেলে আকাশ বিজয়বর্গীয়র দায়ের করা একটি মানহানি মামলার জেরে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, একটি রাজনৈতিক সভা থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্য মঞ্চে কৈলাস বিজয়বর্গীয়কে ‘গুন্ডা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতেই ভোপালের বিশেষ এমপি-এমএলএ আদালতে অভিষেকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা রুজু করা হয়।

নিম্ন আদালত থেকে মামলার শুনানির জন্য একাধিকবার সমন বা নোটিশ পাঠানো হলেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হাজিরা দেননি বলে অভিযোগ ওঠে। এরপরই আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। সেই সময় আইনি সুরক্ষার খোঁজে অভিষেক মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলে উচ্চ আদালত পরোয়ানার ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ বা রক্ষাকবচ দিয়েছিল। তবে বুধবার হাইকোর্ট সেই স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়ায় আইনি দিক থেকে সুদূর মধ্যপ্রদেশেও বিপাকে পড়লেন এই যুবনেতা।

দলীয় অন্দর ও তদন্তকারী সংস্থার চতুর্মুখী চাপ

শুধুমাত্র মধ্যপ্রদেশের মামলাই নয়, এই মুহূর্তে ঘরের মাঠ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের বুকেও চরম রাজনৈতিক ও একাধিক আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

  • দলের অন্দরে তীব্র অসন্তোষ: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক ভূমিকা ও রণকৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন দলেরই একাংশ। একাধিক প্রবীণ ও বিদ্রোহী নেতা দলীয় বৈঠকে তাঁর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন এবং তাঁর সাংগঠনিক দায়িত্ব পুনর্বিবেচনার দাবিও তুলেছেন।
  • কেন্দ্রীয় এজেন্সির ম্যারাথন জেরা: প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সম্প্রতি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডির (ED) কড়া নজরে রয়েছেন তিনি। সিজিও কমপ্লেক্সে ডেকে পাঠিয়ে তাঁকে টানা ১১ ঘণ্টা ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন ইডির আধিকারিকরা। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে গরুপাচার ও বালিপাচারের মতো আলোচিত মামলাতেও তাঁর নাম উঠে এসেছে।
  • ডায়মন্ড হারবারে জোড়া এফআইআর: নিজের লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবার এবং বিষ্ণুপুর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে জোড়া এফআইআর দায়ের হয়েছে। যার মধ্যে ৩০০ কোটি টাকার বেআইনি মাটি চুরি এবং ২৫০ কোটি টাকার আমফান ঘূর্ণিঝড়ের সরকারি ত্রাণ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
  • রাজ্য পুলিশের তদন্ত: বিধানসভায় বিধায়কদের সই জালিয়াতি করার এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর মামলায় রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি (CID) তাঁকে একাধিকবার তলব করেছে। প্রথমদিকে হাজিরা এড়িয়ে গেলেও পরে আদালতের নির্দেশে ভবানীভবনে গিয়ে তদন্তকারীদের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। এছাড়াও ডিজে বাজানো সংক্রান্ত একটি মন্তব্য মামলার তদন্তেও তাঁর ডাক পড়েছে।

সব মিলিয়ে একদিকে ভিন রাজ্যের আদালতের কড়া অবস্থান, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য এজেন্সির লাগাতার তদন্ত এবং তার ওপর দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন ও সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন তৃণমূলের এই হেভিওয়েট সাংসদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *