ভরাডুবির পর উধাও নিরাপত্তা, বোলপুরে কার্যত গৃহবন্দি অনুব্রত মণ্ডল

নির্বাচনী বিপর্যয়ের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই বীরভূমের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় বদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভোটের ফল প্রকাশের পর যেখানে তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা অনুব্রত মণ্ডল নিয়মিত দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত করছিলেন, সেখানে আচমকা পুলিশি নিরাপত্তা প্রত্যাহার হতেই তিনি কার্যত জনসমক্ষ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। বোলপুরের চণ্ডিদাস রোডে অবস্থিত জেলা তৃণমূল কার্যালয় এখন প্রায় শুনশান, যা বীরভূমের ঘাসফুল শিবিরের অন্দরে তৈরি হওয়া এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নেতৃত্বের অনুপস্থিতি ও কর্মীশূন্য দলীয় কার্যালয়
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বীরভূমের প্রচার ও সাংগঠনিক কৌশল মূলত অনুব্রত মণ্ডল এবং জেলা কোর কমিটির যৌথ পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, জেলার ১১টি আসনের মধ্যে ৬টিই দখল করেছে বিজেপি। এই আশানুরূপ ফলের অভাবে প্রথম থেকেই ধাক্কা খেয়েছিল শাসক শিবির। গণনা পর্বের দিন সকাল থেকে পার্টি অফিসে কর্মী-সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও, পরাজয়ের ছবি স্পষ্ট হতেই সেই উন্মাদনা উধাও হয়ে যায়। বিশেষ করে বোলপুর শহরে দলের পিছিয়ে পড়া নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি করে। এর পর থেকে আর নিচুপট্টি এলাকার দলীয় কার্যালয়ে আগের মতো রাজনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়নি। ফল ঘোষণার পর অনুব্রত প্রতিদিন বিকেলে এসে কিছুটা সময় কাটালেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি এবং জেলা কোর কমিটির অন্য সদস্যরা সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত।
নিরাপত্তা প্রত্যাহার এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব
একসময় বীরভূমের শেষ কথা বলা অনুব্রত মণ্ডলের জন্য প্রশাসন ওয়াই-প্লাস ক্যাটাগরির নিরাপত্তা ব্যবস্থা বরাদ্দ করেছিল। তাঁর সুরক্ষায় মোতায়েন থাকত ১০ জন দেহরক্ষী, সামনে-পিছনে পাইলট গাড়ি এবং বাড়িতে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। সম্প্রতি ধাপে ধাপে সেই বিশেষ নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। প্রথমে দেহরক্ষীর সংখ্যা কমানো এবং পরবর্তীতে বাড়ি থেকে স্থায়ী পুলিশ সরিয়ে নেওয়ার পর থেকেই মূলত জনসমক্ষে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন এই দাপুটে নেতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্য জুড়ে ক্ষমতা ধরে রাখলেও বীরভূমে বিজেপির অভাবনীয় উত্থান এবং অনুব্রতর এই আকস্মিক ‘অন্তর্ধান’ জেলা তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিতকে অনেকটাই দুর্বল করে তুলেছে। জেলা স্তরের শীর্ষ নেতাদের এই দূরত্ব বজায় রাখার নীতি এবং জনরোষের আশঙ্কায় পার্টি অফিস এড়িয়ে চলা তৃণমূলের নিচুতলার কর্মীদের মনোবল আরও ভেঙে দিচ্ছে। নিরাপত্তা প্রত্যাহারের পর অনুব্রত মণ্ডল নিজে সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ না খুললেও, তাঁর এই রহস্যজনক নীরবতা ও জনসমক্ষে অনুপস্থিতি বীরভূমের তৃণমূল সংগঠনকে আগামী দিনে বড়সড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।