সই জালিয়াতি মামলায় ব্যাঙ্কশাল আদালতের বড় ধাক্কা, হাতের লেখার নমুনা দিচ্ছেন ৩ তৃণমূল বিধায়ক

সই জালিয়াতি মামলায় ব্যাঙ্কশাল আদালতের বড় ধাক্কা, হাতের লেখার নমুনা দিচ্ছেন ৩ তৃণমূল বিধায়ক

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচন সংক্রান্ত নথিতে সই জালিয়াতির অভিযোগে এক নজিরবিহীন আইনি মোড় তৈরি হলো। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় মঙ্গলবার কলকাতার ব্যাঙ্কশাল আদালত রাজ্যের তিন শাসক দলীয় বিধায়কের হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছে। আদালতের এই নির্দেশের পর তৃণমূল বিধায়ক অরূপ রায়, শুভাশিস দাস ও বাহারুল ইসলামকে ব্যাঙ্কশাল আদালতের ১৯ নম্বর কোর্টে তাঁদের সই ও হাতের লেখার নমুনা জমা দিতে হবে। এই আইনি সিদ্ধান্তের ফলে মামলাটির তদন্ত প্রক্রিয়া এক নতুন গতি পেল।

তদন্তের নেপথ্য কারণ ও রাজনৈতিক জটিলতা

ঘটনার সূত্রপাত গত মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর। গত ৬ মে কালীঘাটে শাসক দলের বিধায়কদের এক বৈঠকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হয়। পরবর্তীতে ১৩ ও ১৪ মে বিধানসভায় বিধায়কদের শপথগ্রহণের পর নিয়ম মেনে তাঁরা খাতায় সই করেন। এরপর বিধানসভার সচিবের পক্ষ থেকে বিরোধী দলনেতার নাম সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবপত্র চাওয়া হলে, ১৯ মে কালীঘাটে পুনরায় বিধায়কদের বৈঠক ডাকা হয়। সেই বৈঠকে উপস্থিত ও অনুপস্থিত বিধায়কদের নজরদারির জন্য একটি হাজিরা খাতায় সই নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে দলের পক্ষ থেকে ৭০ জন বিধায়কের সই সংবলিত একটি কাগজ বিধানসভার সচিবের কাছে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রস্তাবনাপত্র হিসেবে জমা দেওয়া হয়।

গরমিলের সূত্রপাত ঠিক এখানেই। বিধানসভার মূল খাতার সইয়ের সঙ্গে জমা দেওয়া প্রস্তাবপত্রের সই না মেলায় বিধানসভা সচিবের মনে জালিয়াতির সন্দেহ জাগে এবং তিনি থানায় এফআইআর দায়ের করেন। ঘটনার তদন্তভার হাতে নেয় সিআইডি। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন দলেরই দুই বিধায়ক সন্দীপন সাহা ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন যে, ১৯ তারিখের হাজিরা খাতার পাতা ছিঁড়েই নাকি রেজুলিউশন বা প্রস্তাবনার কাগজ হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে। এই বিস্ফোরক দাবির পর দল তাঁদের বহিষ্কার করলেও বিতর্ক থামেনি। অন্যদিকে বাহারুল ইসলাম, অরূপ রায় এবং শুভাশিস দাস নামের ৩ বিধায়ক সরাসরি লিখিত অভিযোগ জানান যে তাঁরা ওই বৈঠকে উপস্থিতই ছিলেন না, অথচ তাঁদের সই ব্যবহার করা হয়েছে।

আইনি ও রাজনৈতিক প্রভাব

আদালতের এই নতুন নির্দেশের ফলে সই জালিয়াতি মামলার ফরেনসিক তদন্তের পথ আরও প্রশস্ত হলো। বিধায়কদের হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহের পর তা বিধানসভায় জমা পড়া বিতর্কিত নথির সইয়ের সঙ্গে বৈজ্ঞানিকভাবে মিলিয়ে দেখা হবে। যদি ফরেনসিক রিপোর্টে সই জালিয়াতির প্রমাণ মেলে, তবে তা রাজ্য রাজনীতিতে এবং শাসক দলের অন্দরে এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করবে। সিআইডি ইতিমধ্যে নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় বা কুণাল ঘোষদের মতো হেভিওয়েট নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। তদন্তের এই অগ্রগতি আগামী দিনে বিধানসভার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা রক্ষা এবং দলীয় রাজনীতির সমীকরণ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *