হরমুজ সংকটে রক্তস্নাত দালাল স্ট্রিট, যুদ্ধের দামামায় এক ধাক্কায় ১০০০ পয়েন্ট পড়ল সেনসেক্স

হরমুজ সংকটে রক্তস্নাত দালাল স্ট্রিট, যুদ্ধের দামামায় এক ধাক্কায় ১০০০ পয়েন্ট পড়ল সেনসেক্স

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজতেই বিশ্ব বাজারে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ল ভারতীয় শেয়ার বাজারে। হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা কাটানোর সম্ভাবনা কার্যত ভেস্তে যাওয়ায় বুধবার সকালে বাজার খোলামাত্রই ধস নামে দালাল স্ট্রিটে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার বাজারের সূচক লাগাতার নিম্নমুখী হতে থাকে। এক পর্যায়ে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সুচক সেনসেক্স ১০০২.৫৪ পয়েন্ট বা ১.৩৪ শতাংশ নেমে দাঁড়ায় ৭৩,৬৪৭.৩০-তে। একইভাবে জাতীয় স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক নিফটিও ২৮৮.৮৫ পয়েন্ট বা ১.২৩ শতাংশ পড়ে ২৩,১৯৪.৭০-তে এসে ঠেকেছে। ব্যাংক নিফটিও ১০০ পয়েন্টের বেশি কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩,৬২০.৫৫-তে।

বাজারের এই ভয়াবহ পতনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র। টিসিএস (-৮.৩৭%), এলটিএম লিমিটেড (-৭.২০%), টেকমহিন্দ্রা (-৫.৭১%), এইচসিএলটেক (-৪.৯৩%) এবং ইনফোসিস (-৩.৯১%)-এর মতো প্রথম সারির আইটি শেয়ারগুলোর দর হুড়মুড়িয়ে পড়েছে। তবে এই মন্দার বাজারেও ডিএমএআরটি (+২.৯৩%), অ্যাপলো হাসপাতাল (+২.৪৫%), সাইমেন্স এনার্জি (+২.০৪%) এবং ইউনিয়ন ব্যাংক (+১.১৩%)-এর মতো কিছু শেয়ারের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

ধসের নেপথ্যে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ

শেয়ার বাজারের এই আকস্মিক দুর্দশার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে ইরান ও আমেরিকার শান্তিচুক্তি নিয়ে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তা। সম্প্রতি কুয়েত ও বাহরাইনের মতো দেশে ইরানের নতুন করে হামলা চালানোর অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে হুড়মুড়িয়ে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বুধবার ০.৮৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬.৮৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি তুলে নেওয়ায় টাকার দাম লাগাতার কমছে।

রিজার্ভ ব্যাংকের স্বর্ণ মজুত হ্রাস ও সম্ভাব্য প্রভাব

বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যেই ব্লুমবার্গের একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ভারতের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারে বড়সড় টান পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের তরফ থেকে সোনায় আমদানি শুল্ক বাড়ানো হলেও ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের (আরবিআই) সঞ্চিত স্বর্ণভাণ্ডার হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান আর্থিক ধাক্কা সামাল দিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনা বিক্রির পথ বেছে নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বিক্রি করা এই সোনার মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম এবং বিদেশি মুদ্রার সংকটের জোড়া ফলায় ভারতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। হরমুজ প্রণালীর জট দ্রুত না কাটলে এবং বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে দালাল স্ট্রিটের এই রক্তক্ষরণ আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে, যা সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *