পরিবারতন্ত্র আর দুর্নীতিই কী কাল হলো তৃণমূলের, ভাইপো স্নেহে অন্ধ হয়েই ডুবলেন মমতা!

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক ভরাডুবির পর চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। কাটমানি, সিন্ডিকেট রাজ আর নিয়োগ কেলেঙ্কারি নিয়ে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালট বক্সে। তবে এই পরাজয়ের পর রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা হলো— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে দলের রাশ আর কতটা অক্ষুণ্ণ রয়েছে? যে নেত্রী একসময় শূন্য থেকে লড়াই করে বাংলায় একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, তিনি কীভাবে নিজের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে দিলেন, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
অভিষেকের উল্কাবেগে উত্থান ও প্রবীণদের কোণঠাসা হওয়া
২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। যুব তৃণমূলের সভাপতি থেকে শুরু করে সাংসদ পদ এবং পরবর্তীতে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর ক্ষমতা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। তবে এই উত্থান দলের অন্দরে মসৃণ ছিল না। অভিযোগ, অভিষেক দলে ‘কর্পোরেট-শৈলীর রাজনীতি’ আমদানি করেন এবং আই-প্যাকের মতো সংস্থাকে ব্যবহার করে দলের বহু প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতাকে কোণঠাসা করতে শুরু করেন। একটা সময় প্রবীণদের অবসরের তত্ত্ব আউড়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল দলের পুরনো অবয়বকে। বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমস্ত কিছু দেখেও ভাইপোর স্নেহে অন্ধ হয়ে ‘ধৃতরাষ্ট্র’-এর মতো নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন, যা দলের অন্দরে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দেয়।
মায়াবতীর তুলনায় মমতার ব্যর্থতা ও মোক্ষম ভুল
রাজনীতিতে পরিবারের সদস্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার পরিণতি প্রায়শই মারাত্মক হয়। এই প্রসঙ্গে উত্তর প্রদেশের বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) সুপ্রিমো মায়াবতীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুলনা টানছেন বিশেষজ্ঞরা। মায়াবতীও একই রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তাঁর ভাইপো আকাশ আনন্দকে দল থেকে সরিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি, যাতে দলের ভাবমূর্তি রক্ষা পায়। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সময়োচিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। নির্বাচনের সময় বিজেপি এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়েছে। তারা প্রচারের মূল অভিমুখ করে তোলে যে, মমতা নিজে সাদামাটা জীবনযাপন করলেও তাঁর ভাইপো দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজ চালাচ্ছেন। কয়লা পাচার, গবাদি পশু পাচার ও শিক্ষক নিয়োগের মতো কেলেঙ্কারির তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে অভিষেক থাকায়, তা জনগণের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর এখন বাঁধ ভেঙেছে দলের অন্দরের ক্ষোভের। নিচুতলার কর্মীরা এখন প্রকাশ্যে কাটমানির টাকা ফেরত দিচ্ছেন এবং অভিষেকের অনুগামীরা রাস্তায় নেমে দলীয় কর্মীদের রোষের মুখে পড়ছেন। সময়মতো ভাইপোর ক্ষমতার লাগাম টানতে না পারা এবং কর্পোরেট বৃত্তের ঘেরাটোপে আসল জনমতকে উপেক্ষা করাই শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে প্রমাণিত হলো।