টয়লেট সিটের চেয়েও নোংরা রান্নাঘরের স্পঞ্জ থেকে ছড়াচ্ছে মরণব্যাধি!

টয়লেট সিটের চেয়েও নোংরা রান্নাঘরের স্পঞ্জ থেকে ছড়াচ্ছে মরণব্যাধি!

দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজে অপরিহার্য উপাদান রান্নাঘরের বাসন মাজার স্পঞ্জ। আপাতদৃষ্টিতে সাবান-জলে ভেজা এই অনুষঙ্গটিকে পরিষ্কার মনে হলেও, সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় একে রান্নাঘরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও নোংরা বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, একটি সাধারণ টয়লেট সিটের তুলনায় একটি ব্যবহৃত পুরনো স্পঞ্জে প্রায় ২০০ গুণ বেশি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকে। সচেতনতার অভাবে এই সাধারণ স্পঞ্জই হয়ে উঠছে ফুড পয়জনিং থেকে শুরু করে কোলন ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের অন্যতম উৎস।

জীবাণুর আঁতুড়ঘর ও রোগের বিস্তৃতি

অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞানী ড. চার্লস গারবারের গবেষণা অনুযায়ী, একটি টয়লেট সিটে গড়ে ১০ লক্ষ ব্যাকটেরিয়া থাকলেও দুই সপ্তাহের পুরনো কিচেন স্পঞ্জে ১০ কোটিরও বেশি ব্যাকটেরিয়া অবস্থান করে। রান্নাঘরের ২০ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং মাছ-মাংসের রস বা খাবারের কণা ব্যাকটেরিয়ার দ্রুত বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। জার্মানির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহের পুরনো স্পঞ্জের প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে ৫৪ বিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া থাকে, যার ৭০ শতাংশই মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

এই স্পঞ্জে ই-কোলাই, সালমোনেলা এবং ক্যাম্পাইলোব্যাকটরের মতো ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা তীব্র ডায়রিয়া, বমি ও উচ্চ জ্বরের মতো ফুড পয়জনিং সৃষ্টি করে। এ ছাড়া, হাতের কাটার মাধ্যমে স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস প্রবেশ করে ত্বকের সংক্রমণ ঘটাতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, স্পঞ্জ সরাসরি ক্যানসার তৈরি না করলেও এতে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দীর্ঘ মেয়াদে পেটে প্রবেশ করলে অন্ত্রে ক্রনিক ইনফ্লেমেশন বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি হয়। টাটা মেমোরিয়ালের অনকোলজিস্ট ডা. রজত সান্যাল জানিয়েছেন, এই প্রক্রিয়া ১০-১৫ বছর ধরে চললে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (IARC) সালমোনেলাকে সম্ভাব্য কার্সিনোজেন বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছে।

ঝুঁকি এড়ানোর উপায় ও বিকল্প ব্যবহার

বিশেষজ্ঞরা রান্নাঘরের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে স্পঞ্জের টেক্সচার নষ্ট হওয়া, টক বা পচা গন্ধ এবং কালো বা সবুজ ছোপ পড়ার মতো লক্ষণ দেখা মাত্রই তা পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন। সাধারণ নিয়মে একটি স্পঞ্জ সাত দিনের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে পরিবারে শিশু, গর্ভবতী নারী বা ক্যানসার আক্রান্ত রোগী থাকলে প্রতি তিন দিন পর পর স্পঞ্জ পরিবর্তন করা জরুরি।

স্পঞ্জ জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য কয়েকটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ভেজা স্পঞ্জ মাইক্রোওয়েভে উচ্চ শক্তিতে এক মিনিট গরম করলে ৯৯.৯ শতাংশ জীবাণু ধ্বংস হয়। এ ছাড়া, ফুটন্ত গরম জলে পাঁচ মিনিট ডুবিয়ে রেখে কিংবা ব্লিচ মিশ্রিত জলে ভিজিয়ে রেখেও এটি পরিষ্কার করা সম্ভব। সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকতে বিশেষজ্ঞরা স্পঞ্জের পরিবর্তে নন-পোরাস সিলিকন স্ক্রাবার, বাঁশের ব্রাশ কিংবা প্রতিদিন ধুয়ে শুকানো যায় এমন পাতলা সুতির ডিশ ক্লথ ব্যবহারের সুপারিশ করছেন। একই সাথে কাটিং বোর্ড, কিচেন টাওয়েল এবং সিঙ্কের নেট নিয়মিত পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে রান্নাঘরকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত রাখা সম্ভব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *