ফিরহাদ হাকিমের ইস্তফার পরেই কেন ভেঙে দেওয়া হবে না কলকাতা পুর বোর্ড, তিন দিনের মধ্যে জবাব তলব করল রাজ্য

মেয়র পদ থেকে ফিরহাদ হাকিমের আচমকা ইস্তফার পরেই এক নজিরবিহীন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়েছে কলকাতা পুরসভা। শুক্রবার মেয়রের পদত্যাগের পরদিনই রাজ্য সরকারের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর থেকে পুরসভাকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে। ১৯৮০ সালের কলকাতা পুরসভা আইনের ১১৭(২) (এ) ধারা অনুযায়ী জারি করা এই নোটিসে জানতে চাওয়া হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন পুর বোর্ড ভেঙে দেওয়া হবে না। এই বিষয়ে কলকাতা পুরসভার কমিশনার ও পুরসচিবকে আগামী তিন দিনের মধ্যে লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিষেবায় অচলাবস্থার আশঙ্কা
রাজ্য সরকারের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, মেয়রের আকস্মিক পদত্যাগের ফলে কলকাতা পুরসভার স্বাভাবিক কাজকর্ম ও নাগরিক পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। সংবিধানে এবং কলকাতা পুরসভা আইনে নাগরিকদের যে পরিষেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা পালনে বর্তমান বোর্ড ব্যর্থ হতে পারে বলেই মনে করছে নবান্ন। ১৯৮০ সালের পুর আইনের ১১৭(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো পুরসভা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে রাজ্য সরকার সর্বোচ্চ ছ’মাসের জন্য সেই বোর্ড ভেঙে দিতে পারে। তবে আইন অনুযায়ী একতরফা এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না বলেই পুরসভাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য এই তিন দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক বিকল্প ও আইনি বিতর্ক
যদি নির্দিষ্ট সময়ের পর পুর বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়, তবে পুর আইনের ১১৮ ধারা অনুযায়ী মেয়র, কাউন্সিলর এবং মেয়র-ইন-কাউন্সিলসহ সকলের পদ একযোগে খালি হয়ে যাবে। সেই পরিস্থিতিতে পুরসভার প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাবেন সরকার নিযুক্ত কোনো প্রশাসক। তবে রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে ইতিমধ্যেই আইনি ও রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কলকাতার প্রাক্তন মেয়র তথা আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, পুর বোর্ড পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার আইনি অধিকার রাজ্য সরকারের নেই। অন্যদিকে, পুর বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সচ্চিদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে সত্তরের দশকের অচলাবস্থার নজির টেনে জানান, এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম পরিষেবা বজায় রাখতে পুর বোর্ড না ভেঙে আপাতত প্রশাসক বসিয়ে কাজ চালানোই শ্রেয়।
ক্ষমতাহীন পদের ক্ষোভ
তৃণমূল জমানায় রাজ্যে পুর কমিশনারের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া নিয়ে দলের অন্দরেই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমছিল। বহু কাউন্সিলরই ‘স্বাধীনভাবে’ কাজ করতে না পারার অভিযোগ তুলছিলেন। ইস্তফা দেওয়ার পর প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমও তাঁর ক্ষোভ লুকিয়ে রাখেননি। তিনি স্পষ্ট জানান, ঢাল-তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার হয়ে চেয়ার ধরে রাখার কোনো অর্থ হয় না এবং চেয়ারের সম্মানহানি রুখতেই তিনি পদত্যাগ করেছেন। মেয়রের এই ক্ষোভের পরই নবান্নের এই দ্রুত নোটিস জারি শহরের পুর প্রশাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।