টলিপাড়ার অঘোষিত সম্রাট থেকে হাজতবাস, স্বরূপ বিশ্বাসের উত্থান ও পতনের নেপথ্যে

টলিপাড়ার অঘোষিত সম্রাট থেকে হাজতবাস, স্বরূপ বিশ্বাসের উত্থান ও পতনের নেপথ্যে

গত দেড় দশক ধরে টলিপাড়ার অঘোষিত ‘সর্বেসর্বা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস। তৃণমূল সরকারের আমলে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই হিসেবে পরিচিতি পেলেও, নিজস্ব প্রভাব ও দাপটে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে একপ্রকার নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। সিনেমা, সিরিয়াল কিংবা ওয়েব সিরিজ— শুটিং ফ্লোরে তাঁর অনুমতি ব্যতীত কোনো কাজই প্রায় আসাম্ভব ছিল। স্বরূপের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ‘ফেডারেশন ফরমান’ টলিউডে তৈরি করেছিল এক ভীতিকর পরিবেশ, যেখানে তাঁর মতের বিরুদ্ধে গেলেই জুটত কাজ থেকে নির্বাসন বা ‘ব্যান’-এর মতো শাস্তি।

নিয়ম ও ‘ব্যান কালচার’-এর দাপট

২০১১ সালে ফেডারেশনের দায়িত্ব পাওয়ার পর স্বরূপ বিশ্বাস ইন্ডাস্ট্রিতে একগুচ্ছ নিয়ম চাপিয়ে দেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ছিল কাজ অনুযায়ী টেকনিশিয়ানের সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া। প্রযোজকদের বাধ্য করা হতো অকারণে অতিরিক্ত সংখ্যক কর্মী নিতে, যা স্বাধীন পরিচালক ও প্রযোজকদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। এই নিয়মের মারপ্যাঁচে ‘গুপি শুটিং’ তকমা দিয়ে একাধিক কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

এরই সমান্তরালে টলিপাড়ায় দানা বাঁধে ‘ব্যান কালচার’। ফেডারেশনের ফতোয়া অমান্য করায় পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অনির্বাণ চক্রবর্তী ও ঋদ্ধি সেনের মতো শিল্পীদের কাজের সুযোগ কমে যায়। বহু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কাজ পাওয়ার জন্য ফেডারেশনের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন বিশিষ্ট তারকারাও। এমনকি অভিনেতা ও সাংসদ দেবের মতো ব্যক্তিত্বও স্বরূপের রোষ থেকে সহশিল্পীদের রক্ষা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন। পাশাপাশি, ভিনরাজ্যের প্রযোজক ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের ফলে বাংলা ইন্ডাস্ট্রি মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে বলে অভিযোগ।

অবরুদ্ধ টলিপাড়া ও শেষ পরিণতি

স্বরূপ বিশ্বাসের রোষ থেকে বাদ যাননি বাংলাদেশের তারকা শাকিব খানও। তাঁর শুটিংয়ের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক পারিশ্রমিকের দাবি ও হেনস্থার অভিযোগ উঠেছিল। তবে ক্ষমতার দাপটে একচ্ছত্র আধিপত্য চললেও, শেষ রক্ষা হয়নি। গত ৪ জুন এক মহিলা মেকআপ শিল্পীর দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে নিউ আলিপুর থানা গ্রেপ্তার করে স্বরূপ বিশ্বাসকে। অভিযোগকারিণী জানান, কাজ না পাওয়া নিয়ে প্রতিবাদ করায় তাঁকে খুনের হুমকি দেওয়া হয় এবং আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই গ্রেপ্তারির মাধ্যমে। আপাতত তদন্তে বেরিয়ে আসছে স্বরূপ বিশ্বাসের আমলের টলিউডের অন্দরমহলের নানা বিতর্কিত অধ্যায়, যা এক সময় ইন্ডাস্ট্রিকে দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *