দিন কাটছে একই থানার ছোট্ট লকআপে! মশা আর ভ্যাপসা গরমে ছটফট করছেন সব্যসাচী-জয়প্রকাশরা!

একসময় ঘরের বাইরে পা রাখলেই চারপাশ ঘিরে থাকত অনুগামীদের ভিড়। সেলাম ঠোকার জন্য কর্মীর কোনও অভাব ছিল না। কিন্তু রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর এখন ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল ঘর ছেড়ে সল্টলেকের বিধাননগর উত্তর থানার ছোট্ট এবং স্যাঁতস্যাঁতে লকআপে দিন কাটছে তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতাদের। তোলাবাজির মামলায় পুলিশের জালে ধরা পড়া রাজ্য তৃণমূলের সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার, বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্ত এবং কাউন্সিলার রঞ্জন পোদ্দারদের চেনা জগৎটা বদলে গিয়েছে এক লহমায়।

জ্যৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরম আর সল্টলেকের স্বাস্থ্যবান মশার কামড়

লকআপের ভেতরের পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়। ড্যাম ধরা দেওয়াল থেকে খসে পড়ছে চুন-রং, মেঝে সবসময় স্যাঁতস্যাঁত করছে। জ্যৈষ্ঠের এই চরম ভ্যাপসা গরমে যেখানে এসির অভ্যাস, সেখানে মাথার ওপরে নেই কোনও সিলিং ফ্যানও। লোহার গেটের বাইরে একটি স্ট্যান্ড ফ্যান রাখা রয়েছে, যা থেকে হাওয়া ভেতরে পৌঁছানো বেশ কঠিন। তার ওপর যুক্ত হয়েছে সল্টলেকের ‘স্বাস্থ্যবান’ মশার উপদ্রব। প্রতি রাতে মশার গুনগুন গান আর কামড় খেয়েই বিনিদ্র রজনী কাটছে একদা দাপুটে এই নেতাদের। অথচ ঢিল ছোড়া দূরত্বেই রয়েছে তাঁদের নিজস্ব বাড়ি।

তোলাবাজির অভিযোগে শ্রীঘরে তৃণমূলের ‘ভাঙা হাট’

শহরের বাসিন্দাদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিধাননগর উত্তর থানার ‘টিআরপি’ এখন তুঙ্গে। প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও নেতাকে এখানে নিয়ে আসা হচ্ছে, আর বাইরে পা ফেললেই উড়ে আসছে পচা ডিম, টম্যাটো কিংবা গোবর।

  • রঞ্জন পোদ্দার: গত ২০ মে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার তথা ৫ নম্বর বরোর চেয়ারম্যান রঞ্জন পোদ্দারকে তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
  • জয়প্রকাশ মজুমদার: ৩ জুন গ্রেপ্তার হন রাজ্য তৃণমূলের সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার। তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজি ছাড়াও শ্লীলতাহানি, প্রতারণা ও মারধরের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
  • সব্যসাচী দত্ত: গত ৮ জুন ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার, রাজারহাট-নিউটাউনের দু’বারের প্রাক্তন বিধায়ক এবং বিধাননগরের প্রথম মেয়র সব্যসাচী দত্তকে পুলিশ পাকড়াও করে।

বর্তমানে জয়প্রকাশ মজুমদার এবং রঞ্জন পোদ্দার একই লকআপ শেয়ার করছেন। অন্যদিকে, পাশের লকআপে একা মন-মরা হয়ে বসে রয়েছেন সব্যসাচী দত্ত। তাঁর চেহারায় চরম ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। এর আগে ৩০ মে এই থানায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মেয়র পারিষদ তুলসি সিনহা রায়ের স্বামী ভাস্কর সিনহা রায়, তবে পুলিশ সূত্রে খবর, তিনি ইতিমধ্যেই জামিন পেয়েছেন। বাকি হেভিওয়েটরা এখনও পুলিশ হেফাজতে।

চোরদের পাশে নেতারা, লকআপে অদ্ভুত রসায়ন

থানার লকআপের ভেতরে এখন তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। এই হেভিওয়েট নেতাদের ঠিক পাশের কক্ষেই বন্দি রয়েছেন ছিঁচকে চুরির দায়ে অভিযুক্ত অপরাধীরা। অন্য সময় হলে পুলিশের মারের ভয়ে গুটিয়ে থাকা এই চোরদের মুখে এখন এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। যে মশা তাদের রক্ত চুষছে, সেই একই মশা কামড়াচ্ছে টিভির পর্দায় দেখা যাওয়া বড় বড় নেতাদেরও। জামিন পেয়ে বাইরে গিয়ে এই ছিঁচকে চোরেরা এখন বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে, “আমাদের পাশের লকআপেই তো রাত কাটিয়েছেন সব্যসাচী-জয়প্রকাশরা!” ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল নেতাদের এই ‘ভাঙা হাট’ এখন সল্টলেকের অন্যতম বড় চর্চার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *