বাংলাদেশে ঢুকলেই খুন! জিরো পয়েন্টে ৪ দিন মৃত্যুর মুখে থাকা ১২ বাংলাদেশিকে বাঁচাল বিএসএফ

ভূরাজনীতি আর কাঁটাতারের টানাপোড়েনকে ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত জয় হলো পরম মানবতার। টানা চার দিন ও তিন রাত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ‘জিরো পয়েন্টে’ রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর আতঙ্কে কাটানোর পর, অবশেষে উদ্ধার পেলেন তিন পরিবারের ১২ জন বাংলাদেশি নাগরিক। ওপার বাংলার এক শ্রেণীর মানুষের প্রাণনাশের হুমকি ও অনড় মনোভাবের মুখে দাঁড়িয়ে, সম্পূর্ণ মানবিক কারণে এই অসহায় মানুষগুলোকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
জিরো পয়েন্টে ৪ দিন কাটল নারকীয় পরিস্থিতি
নদীয়ার হোগলবেড়িয়া থানার রানিনগর গ্রাম এবং ওপারে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার বিলগাথিয়ার মধ্যবর্তী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ১৪৮/৩-এস পিলারের সংলগ্ন জিরো পয়েন্টে গত শুক্রবার ভোর থেকে শুরু হয়েছিল এই তীব্র মানবিক সংকট। ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে, মাথাভাঙ্গা নদীর ধারে একটি পাটক্ষেতের পাশে আশ্রয় নিয়েছিলেন ৪ শিশু ও নারীসহ ওই ১২ জন নাগরিক।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে আক্রান্তদের অভিযোগের মূল দিকগুলি নিচে তুলে ধরা হলো:
- বিজিবির পথ অবরোধ: শুক্রবার ভোরে ওই নাগরিকেরা যখন বাংলাদেশে নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে যান, তখনই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এবং ওপার সীমান্তের কিছু মানুষ ‘পুশ ইন’-এর মনগড়া অভিযোগ তুলে তাঁদের পথ আটকে দেয়।
- অনবরত খুনের হুমকি: তাঁরা যদি জোর করে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করেন, তবে তাঁদের সরাসরি খুন করা হবে বলে ওপার থেকে ক্রমাগত হুমকি দেওয়া হতে থাকে।
- মারাত্মক অসুস্থতা: খোলা আকাশের নিচে টানা চার দিন রোদ-বৃষ্টির মধ্যে প্রায় অভুক্ত অবস্থায় কাটানোর ফলে ৪ শিশুসহ প্রায় সকলেই গুরুতর শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
আন্তর্জাতিক নিয়ম সরিয়ে উদ্ধার করল বিএসএফ
সীমান্তে এই মারাত্মক ও অমানবিক পরিস্থিতির খবর পৌঁছানো মাত্রই বিএসএফের স্থানীয় কর্তারা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বিষয়টি শীর্ষ আধিকারিকদের জানান। সোমবার বিকেলে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে একটি ফ্ল্যাগ মিটিং ডাকা হয়েছিল। কিন্তু ওপার বাংলার একাংশের চরম অনড় মনোভাবের কারণে দীর্ঘ বৈঠকেও কোনও সমাধান সূত্র মেলেনি।
অসহায় মানুষগুলোর ওপর ওপার থেকে আসা অনবরত প্রাণনাশের হুমকি এবং তাঁদের দ্রুত অবনতিশীল স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে বিএসএফের উচ্চপদস্থ কর্তারা এক মুহূর্তও দেরি না করার সিদ্ধান্ত নেন। আন্তর্জাতিক নিয়মের সমস্ত জটিলতা একপাশে সরিয়ে রেখে, খাঁটি মানবিকতার তাগিদে বিএসএফ জিরো পয়েন্ট থেকে ওই ১২ জনকে উদ্ধার করে ভারতীয় ভূখণ্ডে নিয়ে আসে।
সুচিকিৎসার জন্য কলকাতায় স্থানান্তর
সীমান্ত থেকে উদ্ধারের পরপরই বিএসএফের চিকিৎসকেরা ওই ১২ জন বাংলাদেশির প্রাথমিক ও আপদকালীন চিকিৎসা শুরু করেন। তবে দীর্ঘ ধকল, অনাহার ও আতঙ্কের কারণে তাঁদের শারীরিক অবস্থার আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। তাই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিএসএফের বিশেষ তদারকিতে তাঁদের কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছে এবং সেখানে একটি হাসপাতালে তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ঘটনার পর সীমান্তে কিছুটা টানটান উত্তেজনা থাকলেও, বিএসএফের এই মানবিক পদক্ষেপ সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছে।