গভীর রাতে হাবড়া স্টেশনে রেলের বুলডোজার অ্যাকশন, বামেদের পার্টি অফিস ভাঙতেই ধুন্ধুমার!

হাওড়া, শিয়ালদহ, দমদম কিংবা যাদবপুরের পর এবার রেলের কড়া উচ্ছেদ অভিযানের সাক্ষী হলো উত্তর ২৪ পরগনার অত্যন্ত ব্যস্ত হাবড়া স্টেশন। রেলের দেওয়া ১৫ জুনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেই সোমবার গভীর রাতে হাবড়া স্টেশন চত্বরে নামানো হলো বুলডোজার। একের পর এক বেআইনি দোকান ও পাকা কাঠামোর পাশাপাশি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো সিপিএমের একটি দলীয় কার্যালয়ও। এই উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে মাঝরাতেই ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয় স্টেশন চত্বরে। পুলিশ ও আরপিএফের সঙ্গে বাম কর্মীদের তুমুল বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তিতে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায়।
মাঝরাতে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপ
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতেই স্টেশন লাগোয়া রেলের জমিতে থাকা সমস্ত অবৈধ দোকানপাট সরিয়ে নেওয়ার জন্য হকারদের নোটিস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পার হলেও হকাররা দোকান না সরানোয় সোমবার রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয় রেল কর্তৃপক্ষ।
অভিযানের মূল দিকগুলি নিচে দেওয়া হলো:
- যৌথ টহল: উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে যাতে কোনও বড়সড় অশান্তি না হয়, তার জন্য মাঝরাতেই গোটা স্টেশন চত্বর ঘিরে ফেলে বিশাল কেন্দ্রীয় বাহিনী। উপস্থিত ছিল বনগাঁ-বারাসাত জিআরপি এবং রাজ্য পুলিশও।
- মাইকিং ও উচ্ছেদ: এলাকা খালি করার জন্য রেলের তরফে প্রথমে মাইকিং শুরু হয়। এরপরই একে একে নামানো হয় বুলডোজার। স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও বাইরে গড়ে ওঠা বেআইনি দোকানপাটের পাশাপাশি রেলের জমি দখল করে তৈরি হওয়া বেশ কয়েকটি পাকা ঘরও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
বামেদের পার্টি অফিস ভাঙতেই ছড়াল তীব্র উত্তেজনা
রেলের এই বুলডোজার অ্যাকশনের মুখে পড়ে স্টেশন চত্বরে থাকা সিপিএমের একটি পুরনো পার্টি অফিসও। বেআইনি নির্মাণের তালিকায় থাকায় রেলের বুলডোজার সেটিও সম্পূর্ণ ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেয়।
দলীয় কার্যালয় ভাঙার খবর জানাজানি হতেই মাঝরাতেই স্টেশনে এসে জড়ো হন বহু বাম কর্মী-সমর্থক। তাঁরা রেল এবং পুলিশের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের সঙ্গে বাম কর্মীদের তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ বেগ পেতে হয় মোতায়েন থাকা পুলিশ বাহিনীকে।
নিত্যযাত্রীদের স্বস্তি বনাম হকারদের রুটিরুজির হাহাকার
উত্তর ২৪ পরগনার অন্যতম ব্যস্ততম স্টেশন হলো হাবড়া, যেখান দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার নিত্যযাত্রী যাতায়াত করেন। দীর্ঘদিন ধরেই স্টেশন চত্বরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বেআইনি হকারদের কারণে ব্যস্ত সময়ে চরম বিশৃঙ্খলা ও যানজটের সৃষ্টি হতো। এই নিয়ে নিত্যযাত্রীদের ক্ষোভও ছিল দীর্ঘদিনের। রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা ‘পালাবদল’ ঘটতেই রেলের স্টেশন ও প্ল্যাটফর্মগুলিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এবং সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করার এই মেগা ড্রাইভ শুরু হয়েছে।
তবে এই আকস্মিক উচ্ছেদ নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত হকারদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য:
“কোনও আগাম বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসন না দিয়ে এভাবে মাঝরাতে গরিব হকারদের রুটিরুজি গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। এই ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই আমাদের সংসার চলে। এখন আমরা কোথায় যাব?”
উচ্ছেদের প্রতিবাদে এবং পুনর্বাসনের দাবিতে ইতিমধ্যেই হকারদের একাংশ বিভিন্ন জায়গায় মিছিল-বিক্ষোভ শুরু করেছেন। আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নতুন করে ক্ষোভের আগুন ছড়ানো এড়াতে হাবড়া স্টেশন চত্বরে আরপিএফ ও পুলিশের কড়া নজরদারি জারি রয়েছে।