গোঁফ কামিয়ে মালদ্বীপে পালানোর ছক! ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে ৭ কোটির দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল নেতা

গোঁফ কামিয়ে মলদ্বীপে পালানোর ছক! ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে ৭ কোটির দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল নেতা

হুগলির আরামবাগ পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেতা স্বপন নন্দীর গ্রেফতারির পর এবার সামনে এল এক চরম বিস্ময়কর তথ্য। গ্রিন সিটি প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করে গোঁফ কামিয়ে সম্পূর্ণ ভোল বদলে সুদূর মালদ্বীপে পালিয়ে যাওয়ার ছক কষেছিলেন তিনি। কিন্তু কেরল থেকে আন্তর্জাতিক বিমানে ওড়ার আগেই হুগলি গ্রামীণ পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দলের (SIT) জালে ধরা পড়ে যান এই দাপুটে নেতা। সোমবার তাঁকে চুঁচুড়া আদালতে পেশ করা হলে বিচারক ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।

মালদ্বীপে চম্পটের নিখুঁত ছক ও ভোলবদল

আদালতের সওয়াল-জবাব এবং পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে স্বপন নন্দীর দেশ ছাড়ার এক চাঞ্চল্যকর নীল নকশা। দুর্নীতি সামনে আসতেই আইনি খাঁড়া থেকে বাঁচতে তিনি কেরল হয়ে বিদেশে গা ঢাকা দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।

তদন্তে উঠে আসা মূল তথ্যগুলি নিচে দেওয়া হলো:

  • লুক পরিবর্তন: পুলিশকে ফাঁকি দিতে নিজের চেনা অবয়ব বদলে ফেলেছিলেন প্রাক্তন পুরপ্রধান। তিনি নিজের গোঁফ কামিয়ে সম্পূর্ণ ভোলবদল করেছিলেন, যার ফলে প্রথম দিকে তাঁর অবস্থান সনাক্ত করতে পুলিশকেও বেশ বেগ পেতে হয়।
  • মালদ্বীপের টিকিট: কেরলকে ট্রানজিট পয়েন্ট বানিয়ে তাঁর আসল গন্তব্য ছিল বিলাসবহুল দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করার আগেই গোয়েন্দাদের পাতা জালে আটকে যান তিনি।

পুরসভার তথ্য লোপাট ও ৭ কোটির সোলার কেলেঙ্কারি

মামলার স্পেশাল পিপি (Special PP) বিভাস চট্টোপাধ্যায় আদালতে এক বিস্ফোরক দাবি করেছেন। চেয়ারম্যান পদ চলে যাওয়ার পর নিজের সমস্ত দুষ্কর্মের প্রমাণ মেটাতে পুরসভার মূল কম্পিউটার থেকে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ডেটা এবং সরকারি নথিপত্র মুছে বা ডিলিট করে দিয়েছিলেন স্বপন নন্দী। তবে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মুছে ফেলা সেই তথ্যের এক বিশাল অংশ ইতিমধ্যেই ‘গুগল ক্লাউড’ (Google Cloud) থেকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন তদন্তকারীরা।

আরামবাগ পুরসভার এই ‘গ্রিন সিটি মিশন’ প্রকল্পের দুর্নীতির খতিয়ান:

  • অযোগ্য সংস্থাকে বরাত: আরামবাগের ৪৪টি সরকারি স্কুলে সোলার প্যানেল বসানোর জন্য ৭ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, মোটা টাকার বিনিময়ে এক সম্পূর্ণ অযোগ্য সংস্থাকে এই কাজের বরাত দেওয়া হয়েছিল।
  • কাজ না করেই টাকা গায়েব: বেশ কিছু স্কুলে নামমাত্র সোলার প্যানেল বসানো হলেও, অধিকাংশ স্কুলেই কোনও কাজ করা হয়নি। অথচ কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থাকে পুরো সরকারি তহবিল পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা পরে অবৈধভাবে আত্মসাৎ করা হয়।

রাজনৈতিক তরজা ও ধৃত নেতার সাফাই

বর্তমান পুরপ্রধান সমীর ভাণ্ডারীর দায়ের করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই এই গ্রিন সিটি কেলেঙ্কারির তদন্ত শুরু করে পুলিশ। আরামবাগের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় দাবি করেছেন, স্বপন নন্দী ক্ষমতায় থাকাকালীন সমস্ত সরকারি প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি করেছিলেন এবং তৎকালীন বিধায়ক ও সাংসদেরা সব জেনেও নীরব ছিলেন। অন্যদিকে, বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য স্বপন পাল তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, “তৃণমূল আর দুর্নীতি এখন সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। চাল, ত্রিপল থেকে চাকরি—এরা সব চুরি করেছে। পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত কেউ বাকি নেই।”

অবশ্য নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন ধৃত স্বপন নন্দী। আদালতে যাওয়ার পথে তিনি দাবি করেন, “আমার সময়েই আরামবাগে মেডিকেল কলেজে হেলিপ্যাড তৈরি হওয়াসহ বহু ঐতিহাসিক উন্নয়নের কাজ হয়েছে। আমাকে রাজনৈতিক চক্রান্ত করে ফাঁসানো হচ্ছে। আমি কোনও পালানোর ছক কষিনি, স্রেফ চিকিৎসার প্রয়োজনে কেরলে গিয়েছিলাম।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *