ইপিএফও-র বড় ধাক্কা! কর্মচারীদের থেকে ফেরত নেওয়া যাবে না পিএফ-এর টাকা, ঐতিহাসিক রায় হাইকোর্টের

ইপিএফও-র বড় ধাক্কা! কর্মচারীদের থেকে ফেরত নেওয়া যাবে না পিএফ-এর টাকা, ঐতিহাসিক রায় হাইকোর্টের

ইপিএফও (EPFO) অ্যাকাউন্টধারীদের পক্ষে একটি যুগান্তকারী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনও কর্মচারীকে একবার প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পিএফ-এর টাকা প্রদান করা হয়ে গেলে, তা আর কোনওভাবেই ফেরত নেওয়া বা আদায় করা যাবে না। পিএফ প্রদানের ক্ষেত্রে যদি কোনও নিয়ম লঙ্ঘন বা প্রশাসনিক ত্রুটি হয়েও থাকে, তবে তার সম্পূর্ণ দায় সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তা সংস্থা এবং পিএফ ট্রাস্টের ওপর বর্তাবে, কোনও অবস্থাতেই কর্মচারীর ওপর নয়। আদালত স্পষ্ট করেছে, ইপিএফও প্রামাণ্য ত্রুটির জন্য কো ম্পা নি বা ট্রাস্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলেও কর্মচারীর গায়ে হাত দিতে পারবে না।

আড়াই কোটির পিএফ ও ইয়েস ব্যাংকের বন্ড বিতর্ক

এই পুরো আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন জেভি নৃপেন্দ্র রাও নামের এক চাকুরিজীবী। তিনি এমন একটি সংস্থায় কর্মরত ছিলেন, যার নিজস্ব পিএফ ট্রাস্ট ছিল। ১৯৮১ সাল থেকে ওই ট্রাস্টটি ‘অব্যাহতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান’ (Exempted Establishment) হিসেবে বিশেষ মর্যাদা ভোগ করে আসছিল।

বিতর্কের মূল ঘটনাক্রম নিচে দেওয়া হলো:

  • মর্যাদা বাতিল ও অর্থ প্রদান: ২০২৩ সালের ১ মার্চ ওই ট্রাস্টের অব্যাহতিপ্রাপ্ত মর্যাদা বাতিল করা হয়। এর কিছুদিন পর, ২০২৩ সালের ২১ জুলাই ট্রাস্টটি ওই কর্মচারীকে পিএফ বাবদ প্রায় ২.৫ কোটি টাকা প্রদান করে। নিয়ম অনুযায়ী তাঁর আরও ৭০ লক্ষ টাকা পাওয়ার কথা ছিল।
  • ইয়েস ব্যাংকে তহবিল আটকে যাওয়া: ওই ট্রাস্টের তহবিলের একটি বড় অংশ ইয়েস ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগ করা ছিল। কিন্তু রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-এর নির্দেশে সেই বন্ড আচমকা জব্দ বা ফ্রিজ হয়ে যায়।
  • ইপিএফও-র আপত্তি: পরবর্তীতে ইপিএফও দাবি করে, ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সরাসরি কর্মচারীর অ্যাকাউন্টে পিএফ-এর টাকা পাঠানো সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। নিয়ম মেনে এই টাকা প্রথমে ইপিএফও-র তহবিলে স্থানান্তর করার কথা ছিল। এই যুক্তিতেই তারা ওই কর্মচারীকে সুদসহ পুরো টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

শো-কজ ছাড়াই রিকভারি নোটিশ পাঠিয়েছিল ইপিএফও

এই প্রশাসনিক জটিলতার জেরে গত ২০২৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি ইপিএফও ওই কর্মচারীর বিরুদ্ধে সরাসরি একটি অর্থ আদায়ের বা রিকভারি নোটিশ জারি করে। প্রভিডেন্ট ফান্ড কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, পদ্ধতিগত ভুলের কারণে এই টাকা কর্মচারীর কাছে থাকতে পারে না।

ইপিএফও-র এই আকস্মিক পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন ওই কর্মচারী। আদালতে তিনি জোরালো সওয়াল করেন যে, তাঁর পিএফ-এর টাকা সম্পূর্ণ আইনসম্মত উপায়েই তাঁকে দেওয়া হয়েছে। যদি কোনও পদ্ধতিগত বা লজিস্টিক ত্রুটি হয়ে থাকে, তবে তার দায় কো ম্পা নি ও পিএফ ট্রাস্টের, এর জন্য একজন কর্মচারীকে হেনস্তা করা যায় না।

ট্রাস্টের ভুলের সাজা কর্মচারী পাবেন কেন, প্রশ্ন আদালতের

উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানির পর তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট প্রভিডেন্ট ফান্ড কর্তৃপক্ষের তীব্র সমালোচনা করে কর্মচারীর পক্ষে রায় দেয়। আদালত সাফ জানায়, পিএফ-এর জমানো টাকা একজন কর্মচারীর আইনি অধিকার এবং তা একবার পেমেন্ট করার পর ফেরত চাওয়ার কোনও যৌক্তিকতা নেই।

হাইকোর্টের রায়ের মূল পর্যবেক্ষণগুলি:

“ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পিএফ-এর টাকা ইপিএফও-র মূল তহবিলে হস্তান্তর করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট কো ম্পা নি এবং তার ট্রাস্টের। যদি কোনও নিয়ম লঙ্ঘন হয়ে থাকে, তবে পিএফ কর্তৃপক্ষের উচিত সংস্থার ম্যানেজমেন্ট ও ট্রাস্টের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া। তার জন্য কোনও কর্মচারীকে বলির পাঁঠা বানানো যাবে না।”

আদালত আরও একটি বড় ত্রুটি সামনে এনেছে। বিচারক জানান, ওই কর্মচারীর বিরুদ্ধে এত বড় অঙ্কের টাকা আদায়ের নোটিশ জারি করার আগে তাঁকে কোনওরকম কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) দেওয়া হয়নি, এমনকি নিজের বক্তব্য জানানোর জন্য কোনও ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগও দেওয়া হয়নি, যা প্রাকৃতিক নিয়মের পরিপন্থী। এই সমস্ত গাফিলতির ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট ইপিএফও-র পাঠানো রিকভারি নোটিশটি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *