হাওড়ার এক অচেনা বাড়িই এখন জাতীয় রাজনীতির ভরকেন্দ্র! রাতারাতি লাইমলাইটে কুন্ডু দম্পতি

একটি প্রায় অপরিচিত ও অচেনা রাজনৈতিক দল থেকে রাতারাতি জাতীয় রাজনীতির আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ বা এনসিপিআই (NCPI)। গত রবিবার রাতে তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদ এই দলে যোগ দেওয়ার খবর আসতেই দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। আর এই মেগা দলবদলের পর থেকেই হাওড়ার শাঁকরাইলের হাটগাছা এলাকায় অবস্থিত দলটির সদর দপ্তর এবং এর প্রতিষ্ঠাতা কুন্ডু দম্পতিকে নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল এখন তুঙ্গে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল, সর্বত্রই এখন একটাই আলোচনা— কে এই কুন্ডু দম্পতি আর কী এই এনসিপিআই?
শাঁকরাইলের ‘ওকে আপ ওয়ার্ল্ড’ ভবন ঘিরে ঘনীভূত রহস্য
হাওড়ার শাঁকরাইলের হাটগাছা-বানিপুর এলাকার একটি সাধারণ বাড়ি যে হঠাৎ দেশের হেভিওয়েট রাজনীতিকদের নতুন ঠিকানা হয়ে উঠবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। বাকুলতলা বি গার্ডেন গেট থেকে নাজিরগঞ্জ হয়ে হাটগাছা এনসি পাল পোল পার হলেই চোখে পড়ে এই ভবনটি, যা আন্দুল স্টেশন থেকেও সহজে গম্য।
ভবনটির মূল বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে দেওয়া হলো:
- সদর দপ্তরের চেহারা: সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটি সবুজ রঙের দোতলা ভবন। যার ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে “ওকে আপ ওয়ার্ল্ড” (Wake Up World)। চারপাশ সবুজ গাছপালায় ঘেরা।
- এনজিও-র আড়ালে রাজনৈতিক দল: স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই ভবনটিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি এনজিও বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কার্যালয় চলত। প্রতিবেশী বা এলাকাবাসীর দূরতম পরোক্ষেও ধারণা ছিল না যে, এই শান্ত পরিবেশের আড়ালে একটি জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক দলের সদর দপ্তর গড়ে উঠেছে।
২০২২ সালে প্রতিষ্ঠা এবং কুন্ডু দম্পতির রাজনৈতিক যাত্রা
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২২ সালে এনসিপিআই (NCPI) দলটির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। পেশায় আইনজীবী শিউলি কুন্ডু এবং তাঁর স্বামী উত্তিয়া কুন্ডু হলেন এই দলের মূল প্রতিষ্ঠাতা।
দলটির পূর্ববর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খতিয়ান:
- পঞ্চায়েত নির্বাচনে অংশগ্রহণ: ২০২৩ সালের পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় এই সংগঠনটি প্রথমবার রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্থানীয় যোধাত গ্রাম পঞ্চায়েতে এনসিপিআই-এর নিজস্ব নির্বাচনী প্রতীকে প্রার্থীও দিয়েছিলেন কুন্ডু দম্পতি।
- সংবাদপত্রের সম্পাদনা: এনজিও পরিচালনা এবং রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি উত্তিয়া কুন্ডু ‘জাগো বিশ্ব’ নামক একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন। এই ‘জাগো বিশ্ব’ নামক সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্য শিবির আয়োজন এবং দরিদ্রদের সাহায্য করার মতো বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত।
‘আমরা তো ভাবতেও পারিনি!’ প্রতিবেশীদের চোখে কুন্ডু দম্পতি
হঠাৎ করে একটি অখ্যাত দল দেশের ২০ জন সাংসদের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ায় চরম হতবাক কুন্ডু দম্পতির প্রতিবেশী ও পরিচিতরা। সমাজমাধ্যমে এবং চায়ের দোকানে এখন এই নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
স্থানীয়দের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া নিচে তুলে ধরা হলো:
“আমি দীর্ঘদিন ধরে জানতাম যে উত্তিয়া বাবু একটি সাধারণ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা এনজিও চালাতেন। কিন্তু তিনি যে ভেতরে ভেতরে একটি আস্ত রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এবং দেশের প্রথম সারির নেতারা তাঁর দলে যোগ দেবেন, তা আমার কোনও ধারণাই ছিল না।”
— রাজ মল্লিক, স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউটিউবার
“উত্তিয়া বাবুর বাড়ি আমার বাড়ির খুব কাছেই। এনসিপিআই-এর সদর দপ্তর যে এই হাটগাছা এলাকাতেই অবস্থিত, তা আমি বা এই এলাকার কোনও সাংবাদিকই জানতাম না। এমনকি এই দলটার নামই আমরা প্রথম শুনলাম।”
— দিব্যেন্দু ঘোষ, স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিক
জোরদার নিরাপত্তা ও কুন্ডু দম্পতির রহস্যময় অন্তর্ধান
তৃণমূলের ২০ বিদ্রোহী সাংসদ এই দলে নাম লেখানোর পর থেকেই এনসিপিআই কার্যালয়টির বাইরে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। প্রশাসনের তরফ থেকে ইতিমধ্যেই ভবনটির বাইরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই কৌতূহলী সাধারণ মানুষকে এই রাজনৈতিক সদর দপ্তরের চারপাশে ভিড় জমাতে দেখা গেছে।
তবে এই বিপুল রাজনৈতিক আলোড়নের মাঝেও দলটির প্রতিষ্ঠাতা কুন্ডু দম্পতির কোনও খোঁজ মেলেনি। পুরো বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী শিউলি কুন্ডু কিংবা উত্তিয়া কুন্ডুর প্রতিক্রিয়া জানার জন্য সংবাদমাধ্যমের তরফ থেকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, তাঁদের দুজনেরই মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, দিল্লির বড় নেতাদের নির্দেশেই আপাতত লাইমলাইট থেকে দূরে আড়ালে রয়েছেন এই দম্পতি।