চেম্বারে বসে স্পিকার কীভাবে বুঝলেন কে ঠিক? বিরোধী দলনেতা মামলায় হাইকোর্টে চরম অস্বস্তিতে শাসক শিবির!

বিধানসভার বিরোধী দলনেতা বাছার ক্ষমতা আসলে স্পিকারের কতটা? তিনি কি নিজের চেম্বারে বসেই এই বিষয়ে শেষ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, নাকি তাঁর ভূমিকা আসলে অনেকটাই সীমিত? ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের এই হাইপ্রোফাইল ‘বিরোধী দলনেতা’ দ্বন্দ্বের জট এবার পৌঁছাল কলকাতা হাইকোর্টে। আর মঙ্গলবার এই মামলার শুনানিতেই স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক অত্যন্ত অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলল আদালত। ক্ষুব্ধ বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, চেম্বারে বসে স্পিকার কীভাবে বুঝলেন কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল? প্রয়োজনে গোটা বিষয়টি ‘পুলিশ তদন্ত করে দেখুক’ বলেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছে হাইকোর্ট।
আসল বিবাদটি ঠিক কী?
রাজ্য বিধানসভার শাসকদল তৃণমূলে সাম্প্রতিক ভাঙন এই সংঘাতের মূলে রয়েছে। তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ বিধায়কেরা জোট বেঁধেছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে। মূল সংঘাত তৈরি হয় বিধানসভার বিরোধী দলনেতার পদটি নিয়ে। তৃণমূলের মূল শিবিরের তরফে প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হলেও, স্পিকার কিন্তু বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেন। স্পিকারের এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ বেআইনি দাবি করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষ।
আদালতে সওয়াল-জবাব এবং বিচারপতির কড়া প্রশ্ন
এদিন শুনানির শুরুতে স্পিকারের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবী বিল্বদল ভট্টাচার্য দাবি করেন, এই ক্ষেত্রে স্পিকারের ভূমিকা কিছুটা সীমিত হলেও স্পিকারকে কোনও ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
আইনজীবী বিল্বদল ভট্টাচার্য আদালতে আরও দাবি করেন:
- ১৯ মে-র রেজোলিউশন: গত ১৯ মে একটি রেজোলিউশন বা প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল। সেখানে অন্য একজনের নাম প্রস্তাব করা হয় এবং বিধায়কদের সইও ছিল, যা মামলাকারী নিজেও জানতেন।
- ব্লক লেটারে স্বাক্ষর: মামলাকারী পক্ষ ৬ মে-র যে রেজোলিউশনের কথা বলছেন, সেদিন কারও সই নেওয়া হয়নি, মূলত সই হয়েছিল ১৯ তারিখ। আর সেই স্বাক্ষরগুলি সব ব্লক লেটারে (Block Letters) লেখা। বিধানসভার নথিতে বিধায়কদের যে মূল স্বাক্ষর রয়েছে, তার সঙ্গে এগুলি মিলিয়ে দেখা বা ট্যালি করা এখনও বাকি আছে।
স্পিকারের আইনজীবীর এই সওয়ালের পরই এজলাসে একের পর এক কড়া প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন বিচারপতি। তিনি জানতে চান, “যেদিন প্রথম দিন শোভনদেবের নাম বলা হয়েছিল, সেদিন বিধানভায় কতগুলি রাজনৈতিক দল ছিল? সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া বিরোধী দলই কি নাম প্রস্তাব করে? তাদের প্রস্তাব করা নাম উপেক্ষা করে স্পিকার কি নিজের মতো অন্য কাউকে বিরোধী দলনেতা নিয়োগ করতে পারেন?”
‘চেম্বারে বসে কীভাবে সিদ্ধান্ত?’ প্রশ্ন হাইকোর্টের
স্পিকারের আইনজীবী পাল্টা দাবি করেন, যাঁরা পরে তৃণমূলের তরফে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তাঁদের সংখ্যাধিক্য বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। কিন্তু স্পিকার শিবিরের এই যুক্তিতেও আদালত সন্তুষ্ট হয়নি।
বিচারপতি পাল্টা প্রশ্ন তোলেন:
“যদি একই দল থেকে দুটি আলাদা নাম প্রস্তাব করা হয়, তবে স্পিকার ঠিক কী করবেন? তিনি কি নিজের ইচ্ছামতো একটা নাম বেছে নেবেন? নাকি দুই পক্ষকেই ডেকে তাঁদের বক্তব্য বলার সুযোগ দেবেন?”
পাশাপাশি, সংখ্যার বিষয়ে স্পিকারের একতরফা সিদ্ধান্তকে কার্যত কাঠগড়ায় তোলে আদালত। বিচারপতির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, যাঁরা আগে স্বাক্ষর করেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই দু’টি ক্ষেত্রেই সই করেছেন। তাহলে স্পিকার বিধানসভার অধিবেশন না ডেকে বা বিধায়কদের মুখোমুখি না হয়ে কীভাবে নিজের চেম্বারে বসে বুঝলেন কে ঠিক আর কে ভুল? আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, এই সইয়ের গরমিল এবং ত্রুটি কোথায় ছিল, তা প্রয়োজনে পুলিশই তদন্ত করে দেখুক।
হাইকোর্টের এই তীব্র কড়া অবস্থানের পর স্বাভাবিকভাবেই চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন বিধানসভার স্পিকার তথা শাসক শিবির। তবে এই হাইভোল্টেজ আইনি লড়াই এখানেই থামছে না। জানা গিয়েছে, আগামীকাল অর্থাৎ বুধবার দুপুরেই ফের এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।