বিদ্রোহের ঝড়ে বিপর্যস্ত তৃণমূল, দুঃসময়ে ‘পাকা চুলে’ই ভরসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের!

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর চরম সংকটের মুখে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। ২৯৪টি আসনের মধ্যে মাত্র ৮০টি আসন ঘাসফুল শিবিরের দখলে এলেও, দলের সিংহভাগ বিধায়কই এখন বিদ্রোহী রূপ ধারণ করেছেন। ইতিমধ্যেই ৬৫ জন বিধায়ক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গ ছেড়ে ‘ভালো তৃণমূল’ নামক নতুন শিবিরে যোগ দিয়েছেন। লোকসভা নির্বাচনেও দলের পারফরম্যান্স অত্যন্ত বিপর্যয়কর। এই তীব্র অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও বিদ্রোহের আবহে দলকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে জেলাস্তরে বড়সড় সাংগঠনিক রদবদল করলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলের এই চরম দুঃসময়ে তরুণ নেতৃত্বের চেয়ে প্রবীণ, অভিজ্ঞ এবং অনুগত ‘দিদি’ অনুগামীদের উপরই বেশি আস্থা রেখেছেন তিনি।
বিক্ষোভের আবহে চেনা মুখে আস্থা
নতুন সাংগঠনিক কমিটি অনুযায়ী, উত্তর কলকাতা জেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কুণাল ঘোষকে। দলের কঠিন সময়েও নেত্রীর পাশে থেকে লড়াকু মেজাজে সোচ্চার থাকার পুরস্কার পেলেন তিনি। দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূলের সভাপতি পদে দেবাশিস কুমারের জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়কে। অন্যদিকে, হুগলির শ্রীরামপুরে ফের দলের প্রবীণ নেতা অসিত মজুমদারের কাঁধেই সঁপে দেওয়া হয়েছে সাংগঠনিক দায়িত্ব। গত নির্বাচনে তাঁর বদলে দেবাংশু ভট্টাচার্যকে প্রার্থী করা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তবে ভোটে হারের পর দেবাংশু নেত্রীর থেকে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করায় পুরনো ও অভিজ্ঞ অসিতেই ফের ভরসা রাখল দল।
রদবদলের হাওয়া লেগেছে অন্যান্য জেলাতেও। ব্যারাকপুর সাংগঠনিক জেলায় ‘বিদ্রোহী’ পার্থ ভৌমিকের বদলে দায়িত্ব পেয়েছেন অমিত গুপ্ত। হাওড়া সদরে বড় পরিবর্তন ঘটিয়ে বিদায়ী বিধায়ক অরূপ রায়কে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যিনি বর্তমানে ঋতব্রতদের বিদ্রোহী শিবিরে সামিল। তাঁর জায়গায় নতুন সভাপতি হয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও পূর্ব বর্ধমানে রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, পশ্চিম বর্ধমানে নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান পদে অভিজ্ঞ নেতা গৌতম দেবকে ফিরিয়ে এনে ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করা হয়েছে।
আগামী দিনে সম্ভাব্য প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই রদবদলের মূল কারণ হলো দলের অন্দরের তীব্র অসন্তোষ ধামাচাপা দেওয়া এবং সংগঠনকে নতুন করে সাজিয়ে রাজনৈতিক ময়দানে ঘুরে দাঁড়ানো। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবীণ নেতাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাধারণ কর্মীদের ভেঙে পড়া মনোবল চাঙ্গা করা এবং সবাইকে এক ছাতার তলায় নিয়ে এসে সংগঠনকে নতুন করে সক্রিয় করে তোলা। তবে সাংগঠনিক এই রদবদলের মধ্যেই দলের অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছে দলীয় কার্যালয়ের ঠিকানাটি। যে বাড়ি থেকে এই নতুন কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেই বাড়ির মালিক মন্টু সাহা ইতিমধ্যেই তা দখলমুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূলের সাংগঠনিক সংকটের গভীরতাকেই প্রকাশ করছে।